পাকিস্তানের পুনরুত্থান: সামরিক শক্তির ওপর ভর করে কূটনৈতিক উত্থান
পাকিস্তানের পুনরুত্থান: সামরিক শক্তির ওপর ভর করে কূটনৈতিক উত্থান

বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত কিংবা প্রান্তিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত পাকিস্তান হঠাৎ করেই নিজেকে সগৌরবে জাহির করছে। ইরানের শান্তিপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা দেশটিকে সংবাদপত্রের শিরোনামে নিয়ে এসেছে। তবে এই পরিবর্তনটি দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হয়েছে। এটি মূলত পাকিস্তানের কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে নয়, বরং দেশটির ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির কারণে সম্ভব হয়েছে।

পাকিস্তান এখন আর সাহায্যপ্রার্থী কোনো জাতি নয়, কিংবা তার ধনী আরব প্রতিবেশীদের কাছে কোনো ‘গরিব আত্মীয়’ নয়, এমনকি দশকের পর দশক ধরে চলা উগ্রবাদ দিয়েও এখন আর তাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় না। দেশটির অর্থনীতি এখনো সুসংহত নয়, আর উগ্রবাদও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তবে পাকিস্তানকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। কূটনৈতিক সাফল্য, বিশেষ করে প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের মুখোমুখি আলোচনায় বসানোর কৃতিত্ব থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের এই নতুন অবস্থান আলোচনার চেয়ে সামরিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর বেশি নির্ভরশীল।

এই বাস্তবতা কেবল পাকিস্তানকে উঁচুতে তুলছে না, বরং আঞ্চলিক গতিপ্রকৃতিকেও এমনভাবে পুনর্গঠন করছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারত ভাগের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান শুরু থেকেই এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, যেখানে সীমান্ত বিরোধ, ধর্মীয় উত্তেজনা এবং তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বজুড়ে পাকিস্তান তার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সুবিধাবাদী (লেনদেনভিত্তিক) সম্পর্কের মাঝে একটি সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক পথে চলে আসছে। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি কূটনীতির চেয়ে একটি ‘বোঝা’ বা দায় হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাতীয় আত্মবিশ্বাস

এই ‘দায়’ থেকে কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে রূপান্তর হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল ধীরগতির। তবে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সংঘাতের পর এটি দ্রুত ত্বরান্বিত হয়। পাকিস্তান কেবল অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকেনি; বরং তারা আরও সাহসী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। এই সংঘাতের ফলাফল, যা অভ্যন্তরীণভাবে একটি সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে—একটি নতুন জাতীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। এটা দ্রুত কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত হয়। চার দিনের এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

উভয় দেশই সাহসিকতার সঙ্গে আক্রমণ চালিয়েছিল। তবে উন্নত চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় পাকিস্তান সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার দাবি করে এবং ফ্রান্স নির্মিত রাফাল জেটসহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। রণক্ষেত্রের ফলাফলের চেয়ে বিজয়ের এই ধারণাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সেই মুহূর্তটিকে কাজে লাগাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন। দেশের ভেতরে তিনি ক্ষমতা সুসংহত করেন এবং বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে সমালোচনা দমন করতে জাতীয়তাবাদী আবেগকে ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে তিনি বেসামরিক সরকারকে সংবিধান পুনর্গঠনে চাপ দেন। এর ফলে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়ে এবং বিচার বিভাগের মতো ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে মুনির সামরিক এই গতিবেগকে কূটনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করতেও সমান তৎপর ছিলেন। যুদ্ধবিরতির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগ নিবিড় হয়। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক নৈশভোজে আবিষ্কার করেন, যা যুদ্ধের আগে অসম্ভব বলে মনে হতো। এর মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানকে একটি ‘চিরস্থায়ী সমস্যা’র বদলে একটি ‘স্থিতিশীল শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন।

একই সময়ে, পাকিস্তান চীনের সঙ্গে তার কৌশলগত মিত্রতাকে আরও জোরদার করেছে। এটাকে ইসলামাবাদে বলা হয়, ‘হিমালয়ের চেয়েও উঁচু, মহাসাগরের চেয়েও গভীর’। একই সঙ্গে পাকিস্তান অন্যত্র তার নিরাপত্তা উপস্থিতিও বিস্তৃত করেছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, লিবিয়ার সঙ্গে ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং মিসরের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী আলোচনা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ ছিল না; এগুলো ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতাকে টেকসই ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের রূপ দেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এটি কোনো প্রচলিত কূটনৈতিক উত্থান নয়। এটি এমন এক উত্থান, যা সামরিক সাফল্যের মুদ্রার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে।

বিরল মধ্যস্থতাকারী

এই প্রভাব পাকিস্তানকে একটি বিরল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ দিয়েছে, যা ওয়াশিংটন থেকে বেইজিং, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে উত্তর আফ্রিকা—পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোজুড়ে কাজ করতে সক্ষম। এভাবে এটি নিজেকেও একটি বৃহত্তর, আরও আন্তসংযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জালে যুক্ত করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সীমানার অনেক বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত।

আঞ্চলিকভাবে, এই আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় অবস্থানে রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে, যা এমন এক নেতৃত্বকে প্রতিফলিত করে, যারা এখন বিশ্বাস করে যে নিজেদের স্বার্থ সরাসরি প্রয়োগ করার জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রভাব ও পরিসর দুটোই রয়েছে।

ভারত ও আফগানিস্তান—উভয়ের প্রতিই তাদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট এবং কখনো কখনো প্রকাশ্যভাবে আগ্রাসী, যা নতুন শক্তি থেকে কাজ করা একটি রাষ্ট্রের চিত্রকে আরও জোরদার করে। কিন্তু যে পদক্ষেপগুলো পাকিস্তানের অবস্থানকে উঁচুতে তুলেছে, সেগুলোই আঞ্চলিক বিভাজনরেখাগুলোকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে এবং যে পরিসরে এই উত্তেজনা এখন বিস্তার লাভ করছে, সেটিও বড় করেছে।

এর জবাবে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক গতি নির্ধারণে অভ্যস্ত ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক—যা আগেই তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব ছিল—পরিসর ও পরিশীলিততায় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভারতকে একটি পৃথক কিন্তু ছেদযুক্ত নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করছে।

এর ফলাফল আর সীমাবদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এটি এখন আরও জটিলভাবে জড়ানো এবং আরও বিস্ফোরক কৌশলগত পরিবেশ, যেখানে পাকিস্তান ও ভারত শুধু একে অপরের মুখোমুখি নয়, বরং ক্রমশ রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিকভাবে বহিরাগত অংশীদারদের একে অপরের ওপর আচ্ছাদিত সমর্থনে ঘেরা। যা গড়ে উঠছে, তা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রতিযোগিতা—যেখানে সংকট আর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হয় এবং পরে তা আরও বাড়িয়ে তোলা হয়। প্রতিটি সংকেত শুধু ইসলামাবাদ বা নয়াদিল্লিতে নয়, বরং দুবাই, রিয়াদ, তেল আবিব, বেইজিং এবং ওয়াশিংটনেও পাঠ করা হয়।

দ্বিমুখী ধারা

এটাই পাকিস্তানের পুনরুত্থানের দ্বিমুখী দিক। এটি এমন জায়গায় সক্ষমতা দেখিয়েছে, যেখানে একসময় তাকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে দেখা হতো, এবং এমন প্রভাব দেখিয়েছে, যেখানে একসময় তাকে দুর্বল মনে করা হতো। কিন্তু এর মাধ্যমে, এটি এমন একটি কৌশলগত পরিবেশ গঠনে ভূমিকা রেখেছে, যা আরও বেশি আন্তসংযুক্ত এবং তাই আরও ভঙ্গুর। পাকিস্তান বিশ্বকে তার ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনকে অঞ্চলটি ধারণ করতে পারবে কি না? নাকি আরও বিস্তৃত ও বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়ে—যেখানে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে একটি সংকট আর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এমন এক জোট, স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জালে জড়িয়ে পড়ে, যা কোনো পক্ষই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এটাই পাকিস্তানের এই মুহূর্তের প্রকৃত পরিণতি।

ক্যাথি গ্যানন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জন্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাবেক নিউজ ডিরেক্টর এবং এই অঞ্চলগুলো নিয়ে ৩৭ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অভিজ্ঞ কানাডীয় সাংবাদিক।