যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চলছে বড় ধরনের রদবদল। সম্প্রতি একের পর এক শীর্ষ সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ বুধবার কোনও ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই মার্কিন নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলানকে তার পদ থেকে অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘রদবদল’ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঠিক কী ঘটছে মার্কিন সামরিক নেতৃত্বে? এই পরিবর্তনের পেছনে কারণই বা কী?
কী ঘটছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে?
২০২৫ সালের জানুয়ারির পর থেকে মার্কিন সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিভাগে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণ ও পরিবর্তনের এক নজিরবিহীন ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পেন্টাগনে ব্যাপক সংস্কারের চাপ তৈরি করেছেন। তিনি সক্রিয় দায়িত্বে থাকা চার তারকা জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের সংখ্যা অন্তত ২০ শতাংশ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
এই রদবদলের অংশ হিসেবে গত ফেব্রুয়ারিতে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান বিমান বাহিনীর জেনারেল চার্লস ব্রাউনকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্ব পেয়েছিলেন ২০২৩ সালে জো বাইডেনের মনোনয়ন অনুযায়ী। এ ছাড়া নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রথম নারী কর্মকর্তা লিসা ফ্রানচেটি এবং বিমান বাহিনীর ভাইস চিফ অব স্টাফ জেমস স্লাইফকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। ২ এপ্রিল বরখাস্ত হয়েছেন আর্মি চিফ অব স্টাফ র্যান্ডি জর্জ। গোয়েন্দা বিভাগও এই পরিবর্তনের বাইরে নেই। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির পরিচালক টিমোথি হফ এবং হোয়াইট হাউস ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের এক ডজন কর্মীকে ছাঁটাই করেছেন ট্রাম্প।
কেন এই পরিবর্তন?
বিশ্লেষকরা এই রদবদলের পেছনে মূলত দুটি কারণকে দায়ী করছেন: সাংগঠনিক সংস্কার ও প্রশাসনের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা।
নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, তিনি জাহাজ নির্মাণ ত্বরান্বিত করার সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি দেখিয়েছিলেন। অথচ ইরানকে ঘিরে মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে যে অবরোধ তৈরি করেছে, তাতে দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা জরুরি। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেলান পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যার মধ্যে ছিলেন পিট হেগসেথ, তার ডেপুটি স্টিভ ফেইনবার্গ এবং নৌবাহিনীর আন্ডারসেক্রেটারি হাং কাও। তিনি এখন ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব নিচ্ছেন। র্যান্ডি জর্জের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, হেগসেথের সঙ্গে আর্মি নেতৃত্বের বিরোধ এই বরখাস্তের অন্যতম কারণ। এছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষাসচিব লয়েড অস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণেও জর্জকে সরতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধান জেফরি ক্রুসকে সরানো হয়েছিল কারণ তিনি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রশাসনের সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন।
কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এই শুদ্ধি অভিযান?
এই সংস্কার মূলত পিট হেগসেথের নেতৃত্ব ও ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। হেগসেথ তার নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসাতে চাইছেন। যেমন, র্যান্ডি জর্জের জায়গায় এসেছেন ক্রিস্টোফার লানিভ, যিনি হেগসেথের সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক সহকারী ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনের একটি সুপরিকল্পিত ক্যাম্পেইন।
সমালোচনা ও উদ্বেগের সুর
এই ব্যাপক রদবদলকে সামরিক পেশাদারত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড বলেন, ‘এটি ট্রাম্প ও হেগসেথের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি পরিকল্পিত অভিযান বলে মনে হচ্ছে। তারা দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিচ্ছে, যা আমাদের সামরিক বাহিনীর পেশাদারত্বকে ক্ষুণ্ন করবে এবং পুরো বাহিনীর মধ্যে এক ভীতিকর বার্তা পাঠাবে।’
এছাড়া গোয়েন্দা তথ্যকে প্রশাসনের অনুকূলে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার। তিনি বলেন, “ট্রাম্পের গোয়েন্দা তথ্যকে দেশের নিরাপত্তার রক্ষাকবচ না ভেবে বরং ‘আনুগত্যের পরীক্ষা’ হিসেবে গণ্য করার একটি বিপজ্জনক অভ্যাস রয়েছে।”
সূত্র: সিনহুয়া



