বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদারে মস্কোয় বৈঠক
বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদারে মস্কোয় বৈঠক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের মধ্যে সোমবার (৮ জুন) রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সর্বস্তরীয় বিষয়াবলি এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বন্ধুত্বের সূচনা স্মরণ

বৈঠকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় চল্লিশ বছর আগে জাতিসংঘে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের বন্ধুত্ব শুরুর ঐতিহাসিক মুহূর্তটি স্মরণ করেন। বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম।

ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল্যায়ন

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে মস্কো সফররত ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশগুলোর একটি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বৈঠকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী ২০২৭ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ ও জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় উষ্ণ অভিনন্দন জানান। ড. খলিলুর রহমান এই প্রার্থীতায় সমর্থনের জন্য রাশিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক ও খাতভিত্তিক সহযোগিতা

বৈঠকে শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিদ্যমান সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং এসব খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত হয়।

বাণিজ্য সম্প্রসারণ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটা মুক্ত বাজারসুবিধা প্রদানের জন্য রুশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশি পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদ দেন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে রাশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। ড. খলিলুর রহমান হালকা থেকে ভারী প্রকৌশল, খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত উৎপাদন ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো উদীয়মান খাতগুলোতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি

বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউরেশিয়া ইকোনমিক কমিশনের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফপিএ) সম্পাদনে রাশিয়ার জোরালো সমর্থন কামনা করেন। ইউরেশিয়া ইকোনমিক কমিশনের বর্তমান পাঁচ সদস্য হলো- রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান।

আন্তর্জাতিক ফোরামে সমর্থন

বিশ্বমঞ্চের প্রভাবশালী জোট ব্রিকস ও এসসিও-তে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে রুশ সমর্থন চাইলে সের্গেই লাভরভ ইতিবাচক সাড়া দেন।

জ্বালানি ও পারমাণবিক প্রকল্প

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে সফলভাবে জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য রাশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত কমিশনিং করতে রাশিয়ার পূর্ণ সহায়তা কামনা করেন।

জনশক্তি ও মানবিক ইস্যু

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় নিরাপদ ও সুরক্ষিত উপায়ে আরও জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করেন। এই প্রক্রিয়া গতিশীল করতে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্মারক ও চুক্তি, বিশেষ করে পুনর্বাসন চুক্তি ও জনশক্তি চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা। এ ছাড়া রাশিয়ায় আটকে পড়া কয়েকজন বাংলাদেশির নিরাপদ প্রত্যর্পণের বিষয়ে ড. খলিলুর রহমান অনুরোধ জানালে লাভরভ বিষয়টি তার সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ বিবেচনার আশ্বাস দেন।

রোহিঙ্গা সমস্যা

উভয় নেতা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সহায়তা করতে রাশিয়া আগ্রহী বলে জানান।

আমন্ত্রণ

মস্কোয় স্বাগত জানানোর জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান।