জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারিভাবে বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সম্প্রতি বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়রসহ কয়েকজনের প্রস্তাবিত বিদেশ সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। চসিক মেয়রের সফরের ফাইলে দেওয়া মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য আমেরিকার ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যেকোনও ডোবার পাশে দুই-তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যটি কেবল একটি রসিকতা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ‘সরকারি বিদেশ সফর’ সংস্কৃতির প্রতি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এরপর থেকেই সরকারি অর্থে বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল জানতে কি বিদেশ যেতে হয়? খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য কি ইউরোপ সফর অপরিহার্য? পুকুর খনন, সড়কবাতি ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য মৌলিক সেবার অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশ ভ্রমণ কতটা প্রয়োজন বা যৌক্তিক?
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ফ্রান্স সফর ঘিরে বিতর্ক
সর্বশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের সম্ভাব্য ফ্রান্স সফর। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সড়কবাতির প্রযুক্তি দেখতে ফ্রান্সে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রশাসক মাহফুজুর রহমান। যদিও রাজশাহী নগরে ইতোমধ্যে চীন ও পোল্যান্ডে উৎপাদিত সড়কবাতি স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যেই ‘সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেড’ তাদের ‘ডিসপ্লে সিটি’ ও প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ফ্রান্স সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমতি ও ভিসা পেলে আগামী ২০ বা ২১ জুন প্রায় ১০ দিনের সফরে ফ্রান্সে যেতে পারেন প্রশাসক মাহফুজুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) এবিএম আসাদুজ্জামান।
অভিযোগ ওঠার পর বুধবার (৩ জুন) রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানান, গত ১২ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেডের আমন্ত্রণে তারা ফ্রান্সে গিয়ে সিগনিফাইয়ের আউটডোর লাইটিং অ্যাপ্লিকেশন (ওএলএসি) সেন্টার পরিদর্শন করবেন এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সড়কবাতি প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেবেন। সমালোচনার জবাবে প্রশাসক মাহফুজুর রহমান বলেছেন, এটি কেবল প্রযুক্তি পরিদর্শনের আমন্ত্রণ। এর সঙ্গে কোনও ক্রয় বা সরবরাহ চুক্তির সম্পর্ক নেই। তাছাড়া সফরের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমতি ছাড়া যাওয়ার সুযোগ নেই, আর সেই অনুমতিও এখনও পাওয়া যায়নি।
বিদেশ সফর: প্রশাসনিক সংস্কৃতি নাকি প্রয়োজন?
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনও সরকারি প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। কখনও মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেখতে, কখনও স্কুলের মিড-ডে মিল বা খিচুড়ি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণে, আবার কখনও পুকুর খনন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন কিংবা স্থানীয় সরকার পরিচালনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ পাঠানো হয়েছে। এসব সফরের পক্ষে সাধারণত ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন’ এবং ‘সেরা চর্চা (বেস্ট প্র্যাকটিস) সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার’ যুক্তি তুলে ধরা হয়। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে যেসব দেশের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, সেসব দেশের অভিজ্ঞতা কতটা কার্যকরভাবে এখানে প্রয়োগ করা সম্ভব?
সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেটের একটি অংশ প্রায় নিয়মিতভাবেই বিদেশ সফরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সফরগুলো প্রকল্পের প্রয়োজনের চেয়ে ‘প্রকল্প সুবিধা’ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে একই ধরনের বিষয়ে বারবার বিদেশ সফর হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের তেমন কোনও নজির দেখা যায় না। সফর থেকে অর্জিত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়।
অনেকের মতে, মশক নিয়ন্ত্রণ বা খিচুড়ি রান্নার মতো বিষয়গুলো মূলত প্রতীকী উদাহরণ। এর আড়ালে রয়েছে বিদেশ সফরকেন্দ্রিক একটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি। বিদেশ সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা ভ্রমণ ভাতা ও দৈনিক ভাতাসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা পান, যা অনেক ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পে ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ বা দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিদেশ সফরের মাধ্যমে ব্যয় দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের কঠোর সমালোচনা
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বিদেশ সফর এবং প্রশিক্ষণের নামে সরকারি অর্থ ব্যয়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘অপরিহার্য প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া যুক্তিসংগত হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই এসব সফরের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।’ তার মতে, প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফর এখন দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে মূলত ‘সুবিধাভোগের’ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে; যা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পুরোনো সংস্কৃতিরই একটি ধারাবাহিকতা।
ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, সরকারপ্রধানের কঠোর অবস্থানের পরও এ ধরনের বিদেশ সফরের উদ্যোগ অব্যাহত থাকা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এমনকি সড়কবাতি ব্যবস্থাপনা শেখার মতো সাধারণ বিষয়েও বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের অযৌক্তিক অর্থ অপচয়ের কোনও সুযোগ নেই। জনগণের করের টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জবাবদিহির তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, যারা এসব সফরের অনুমোদন দিচ্ছেন এবং যারা এর সুবিধা নিচ্ছেন— উভয়পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। তিনি বলেন, এই নীতিমালায় কোন পরিস্থিতিতে কারা বিদেশে যাবেন এবং ফিরে এসে অর্জিত অভিজ্ঞতা কীভাবে দেশের কাজে লাগাবেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত থাকা জরুরি।
সাবেক সচিবের মতামত
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুকুর খনন শেখার জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই, মশা মারার জন্যও বিদেশ সফরের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের অনেক সফর আসলে রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয়। আমাদের দেশে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও বাস্তব জ্ঞান রয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান বিদেশি বাস্তবতা দিয়ে সবসময় করা সম্ভব নয়। দেশের সমস্যা দেশের বাস্তবতার আলোকে এবং দেশের উপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সমাধান করতে হবে।’
বিদেশে প্রশিক্ষণের পক্ষে দেওয়া যুক্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশে প্রশিক্ষণের বিপক্ষে নই। তবে সেটি হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য কার্যকর। অনেক সময় দেখা যায়, একজন কর্মকর্তা একটি মন্ত্রণালয়ের হয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলেন, কিন্তু কিছু দিন পরই তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলো। তখন প্রশ্ন ওঠে, ওই প্রশিক্ষণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগলো?’ তিনি আরও বলেন, ‘কাউকে বিদেশে পাঠানোর আগে দেখতে হবে—প্রশিক্ষণটি তার বর্তমান দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ কাজের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত। দেশে যদি কোনও বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বা দক্ষতা না থাকে, তাহলে সেই খাতের বিশেষজ্ঞ ও দীর্ঘদিন ওই ক্ষেত্রেই কাজ করবেন– এমন কর্মকর্তাদের পাঠানো উচিত। অন্যথায়, এসব সফরের সুফল রাষ্ট্র বা জনগণের কাছে পৌঁছায় না।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশ সফর এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনায় পরিণত হয়েছে। একসময় পদোন্নতি, গাড়ি বা সরকারি বাসভবন ছিল আকর্ষণের কেন্দ্র। এখন অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ সফরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।’



