মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আশ্বস্ত করেছেন যে, মিয়ানমারের ভূখণ্ড ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী কোনো কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার হতে দেওয়া হবে না। সোমবার (১ জুন) এক বৈঠকে এই আশ্বাস দেন তিনি। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের।
এর আগে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মিয়ানমারের ভেতরে অবস্থান ও তৎপরতা নিয়ে নয়াদিল্লি একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। গত ৩০ জুন রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত যান মিন অং হ্লাইং। আগামী ৩ জুন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তার প্রথম ভারত সফর। গত ৩ এপ্রিল তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর পাঁচ বছর আগে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তিনি ক্ষমতা দখল করেছিলেন।
বৈঠক ও আলোচনার বিষয়বস্তু
সোমবার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন হ্লাইং। দুই নেতার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিসরি জানান, মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, বৈঠকে দুই নেতা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল খনিজসম্পদ (রেয়ার আর্থ), এবং বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী ও নোবেলজয়ী অং সান সু চি’র বিষয়টিও উত্থাপন করেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি আটক রয়েছেন। মিসরি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে, কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন অন্য দেশের নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না হয়।’
উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মিসরি বলেন, মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্যও প্রয়োজনীয়।
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তবর্তী জনগণের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টিও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় তৎপরতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরেছেন। প্রেসিডেন্ট আশ্বাস দিয়েছেন, মিয়ানমার এ বিষয়ে সংবেদনশীল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, যাতে এসব কর্মকাণ্ড ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে ওঠে।’
সু চির বিষয়েও আলোচনা
সু চির প্রসঙ্গে মিসরি বলেন, মোদি বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন শান্তি প্রক্রিয়ার আলোচনার অংশ হিসেবে। তিনি সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ এবং গণতন্ত্রের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করার জন্য নয়। বরং প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ধারাবাহিক সংলাপ বজায় রাখা ভারতের জন্য জরুরি।
মিসরি বলেন, ‘আমরা সবসময় বিশ্বাস করি যে, মিয়ানমারের বর্তমান সংকটের সমাধান মিয়ানমারের জনগণকেই করতে হবে। এটি হতে হবে মিয়ানমারের নেতৃত্বে এবং মিয়ানমারের নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়িত একটি সমাধান।’
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সাইবার প্রতারণা
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে মিসরি জানান, দুই দেশের মধ্যে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছরে মিয়ানমারে পরিচালিত সাইবার প্রতারণা চক্রের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৪০০’ র বেশি ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ১৫০ জন ভারতীয় নাগরিক এসব সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রের মধ্যে আটকে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকার মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।



