মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরপরই যে কজন বিশ্বনেতা এর বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ অন্যতম। ট্রাম্পের একের পর এক হুঁশিয়ারি ও হুমকির মুখেও নিজের নীতিতে অনড় থেকে তিনি এখন ইউরোপে ট্রাম্প-বিরোধী শিবিরের এক অগ্রগামী নেতায় পরিণত হয়েছেন।
যুদ্ধের শুরুতে সানচেজের প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধের শুরুতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে সানচেজ লিখেছিলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই একতরফা সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করছি।’ এই সংঘাত এক প্রতিকূল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। পরের দিন ইরানের ‘ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা’র সমালোচনা করলেও এই যুদ্ধকে ‘একটি অন্যায় ও বিপজ্জনক সামরিক হস্তক্ষেপ’ বলে আখ্যা দেন তিনি।
স্পেনের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি
ইউরোপের অন্যান্য নেতারা যখন ট্রাম্পের সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন, তখন স্পেন তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন অপারেশনের জন্য ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর জবাবে ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে ‘সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ’ করার হুমকি দেন। তবে সানচেজ এই দ্বন্দ্বে বিন্দুমাত্র দমে যাননি। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘কারও প্রতিশোধের ভয়ে আমরা এমন কিছুর অংশীদার হব না যা বিশ্বের জন্য খারাপ এবং আমাদের মূল্যবোধ ও স্বার্থের পরিপন্থি।’
যুদ্ধবিরতির পরও কটাক্ষ
এমনকি এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও সানচেজ কটাক্ষ করে বলেন, ‘যারা বিশ্বজুড়ে আগুন লাগিয়ে দেয়, তারা পরে এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলেই স্পেনের সরকার তাদের জন্য করতালি দেবে না।’
ট্রাম্পের সঙ্গে আদর্শিক বৈপরীত্য
২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা স্পেনের এই সুদর্শন সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক আদর্শের বৈপরীত্য বেশ স্পষ্ট। ট্রাম্প যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকে ‘প্রতারণা’ মনে করেন, সানচেজ সেখানে ২০১৯ সালের পর থেকে স্পেনে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণ করেছেন। ট্রাম্প অভিবাসীদের তাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে, আর সানচেজ স্পেনে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ নথিপত্রহীন (অবৈধ) অভিবাসীকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। ট্রাম্প জাতিসংঘকে মার্কিন স্বার্থের বাধা মনে করেন, অন্যদিকে সানচেজ ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে লড়ছেন।
ইউরোপের অন্যান্য নেতারাও সুর মেলাচ্ছেন
যুদ্ধ শুরুর আড়াই মাস পর এখন দেখা যাচ্ছে, স্পেনের সেই প্রথম দিনের অবস্থানের সঙ্গেই সুর মেলাচ্ছেন ইউরোপের অন্যান্য নেতারা। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে সিসিলির কৌশলগত বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেননি। শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানোয় পোপ লিও চতুর্দশকে ট্রাম্প আক্রমণ করলে মেলোনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন। এর জবাবে ট্রাম্প স্পেন ও ইতালি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘সম্ভবত’।
অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির সমালোচনা করে একে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উৎস বলেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস একে আমেরিকার জন্য একটি ‘অপমান’ হিসেবে দেখছেন এবং তার অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিঙবেল এই ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন যুদ্ধ’ এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এটি একটি একতরফা যুদ্ধ, যে বিষয়ে কোনও মিত্রের সঙ্গে পরামর্শ বা তথ্য শেয়ার করা হয়নি। আজ অন্য ইউরোপীয় সরকারগুলো যা বলছে, তা স্পেন প্রথম দিন থেকেই বলে আসছে।’
আলবারেসের মতে, স্পেনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এসেছে। স্পেন ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলাকেও সমর্থন দিয়েছে স্পেন। ২০২৪ সালে প্রথম সারির পশ্চিমা দেশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয় তারা।
সানচেজের অন্যান্য পদক্ষেপ
চলতি এপ্রিলে প্রগতিশীল বিশ্বনেতাদের এক সম্মেলনে সানচেজ ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউ-এর অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিতের আহ্বান জানান। গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দাবি তোলায় জাতিসংঘ কর্মকর্তা ফ্রান্সেসকা অ্যালবানিজের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা দিলেও চলতি মাসে সানচেজ তাকে স্পেনের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অর্ডার অব সিভিল মেরিট’-এ ভূষিত করেন। গত বছর ন্যাটো সদস্যদের জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে খরচের জন্য ট্রাম্প চাপ দিলে একমাত্র সানচেজই তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আলবারেস বলেন, ‘পৃথিবীতে হয় নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা থাকবে, নয়তো যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা থাকবে। এর মাঝে কিছু নেই।’
ঘরোয়া রাজনৈতিক প্রভাব
অবশ্য সানচেজের এই ট্রাম্প-বিরোধী অবস্থানকে তার ঘরোয়া রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন কিছু সমালোচক। আগামী বছর স্পেনে নির্বাচন। সানচেজ বর্তমানে একটি সংখ্যালঘু সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ডানপন্থি দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া তার সরকারের বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। দেশটিতে আবাসন সংকট এবং সাম্প্রতিক বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে স্পেনের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য রয়েছে। মাদ্রিদের এলকানো রয়্যাল ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মিগুয়েল ওতেরো-ইগলেসিয়াস বলেন, ‘কয়েক মাস আগেও সানচেজের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কম ছিল। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সানচেজ সঠিক কাজটিই করছেন।’
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো নয়। ঐতিহাসিক কারণেই স্পেন আমেরিকার কাছে খুব বেশি ঋণী নয়। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধে স্পেন তার ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপনিবেশগুলো হারিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিস্ট নেতা ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বের কারণে স্পেন ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর কোনও সুবিধাও পায়নি। ইইউ কূটনীতিক জোসেপ বোরেল উল্লেখ করেছেন, আমেরিকা যখন পোল্যান্ডে গণতন্ত্র আনতে সাহায্য করেছিল, তখন তারাই স্পেনে দশকের পর দশক ধরে ফ্যাসিবাদের টিকে থাকাকে সমর্থন জুগিয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্পেন এখন আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও একটি সমন্বিত ইউরোপীয় সেনাবাহিনী গঠনের পক্ষে, যা ন্যাটোর বাইরে থাকবে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকা, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে তারা। সানচেজ চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে জলবায়ু পরিবর্তন ও মহামারির মতো সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস অবশ্য স্পষ্ট করেছেন যে এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক মিত্র। আমরা চাই এটি বজায় থাকুক। তবে এই আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পাশেই এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক আইনের মূল্যবোধকে ধারণ করে।’
সূত্র: নিউ ইয়র্কার



