জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাভারের আশুলিয়া থানায় মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
ঘটনার বিবরণ
প্রশাসনের সূত্রমতে, মঙ্গলবার রাতে পরিত্যক্ত পুরোনো ফজিলাতুন্নেছা হল ও আল বেরুনী হলের বর্ধিত অংশে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, রাত ১১টার কিছু পর ওই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের একটি সড়ক ধরে হাঁটছিলেন। সে সময় অজ্ঞাত ওই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। ফজিলাতুন্নেছা হলের কাছাকাছি পৌঁছালে ওই ব্যক্তি তার গলায় জালের মতো একটি বস্তু পেঁচিয়ে আল বেরুনী হলের বর্ধিত অংশের পাশের ঝোপে টেনে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। তখন চিৎকার দেন ছাত্রী। ওই সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী মোটরসাইকেলে ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা চিৎকার শুনতে পেয়ে এগিয়ে যান। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দফতরকে বিষয়টি জানানো হলে নিরাপত্তাকর্মী ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, ‘রাত ১১টার দিকে ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় ওই শিক্ষার্থীর চিৎকার শুনে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। পরে জঙ্গল থেকে আতঙ্কিত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। ভুক্তভোগী জানান, অপরিচিত এক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে।’
নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেফরুল জানান, রাত আনুমানিক সোয়া ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাকে ঘটনাটি সম্পর্কে জানান। সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু অভিযুক্তকে পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। পরে ফুটেজ দেখে আমরা প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তকে শনাক্ত করতে পেরেছি।’
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও দাবি
এদিকে, শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার প্রতিবাদ এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে দিনভর বিভিন্ন ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সামনে থেকে একটি মিছিল শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রক্টর অফিসের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
পরে শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আট দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করে দ্রুত অভিযুক্তকে শনাক্ত, গ্রেফতার এবং সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা; ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্জন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ক্যাম্পাসজুড়ে কার্যকর সিসিটিভি মনিটরিং বাড়িয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা; নিরাপত্তা শাখার জনবল সংকট দ্রুত দূর করে বিশেষ করে রাতের সময়ে টহল ব্যবস্থা জোরদার করা; নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় জরুরি হেল্পলাইন ও দ্রুত রেসপন্স টিম চালু করা; পূর্বের হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনাগুলোরও সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দেওয়া বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে তার নিন্দা জানিয়েছেন শাখা ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবাধে বহিরাগত প্রবেশের ঘটনা ও ধর্ষণসহ নানা অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার জন্য প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন তারা।
প্রক্টরের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখ দেখা যাচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছি। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, ওই ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়।’
পুলিশের অবস্থান
সার্বিক বিষয়ে আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আজ মামলা করা হয়েছে। তদন্তের জন্য আমরা ইতিমধ্যে ১০ সদস্যের টিম বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়াতে পাঠিয়েছি। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবও মাঠে নেমেছে। আশা করছি, অতিদ্রুত আমরা অপরাধীকে ধরতে পারবো।’



