দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সরকার গঠনের পর দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এখন অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো, ‘নির্বাচন কবে হবে?’ কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত। সেটি হলো, ‘নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কি নতুন কোনো দায়িত্ব এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে?’
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং আর্থিকভাবে বেশ দুর্বল। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের বণ্টন, জেলা পরিষদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, মহানগর শাসনব্যবস্থার কাঠামো, স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, পেশাদার জনবল, পরিকল্পনা প্রণয়নের কর্তৃত্ব এবং জাতীয়-আঞ্চলিক-স্থানীয় পরিকল্পনার সমন্বয়—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অমীমাংসিত বিষয় হলো কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং জবাবদিহির স্পষ্ট বণ্টনের অভাব। জাতীয় নীতি ও আইন প্রণয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, মুদ্রানীতি এবং বৃহৎ অবকাঠামোগত বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে থাকা স্বাভাবিক। তবে নাগরিক সেবা, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোতে স্থানীয় সরকারের কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের নিকটবর্তী অবস্থান। ফলে তারা স্থানীয় সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করতে পারে, জনগণের চাহিদা ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সরাসরি নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন ও সেবা প্রদানের ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় রাখা হয়েছে। উন্নয়ন স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলেও সিদ্ধান্ত ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে। তাই প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ, ক্ষমতার পুনর্বণ্টন এবং স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিই পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
ঢাকা মহানগর: এক শহরে দুই সিটি করপোরেশন এবং অর্ধশতাধিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান
রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বৃহৎ মহানগরকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা। কিন্তু প্রায় ১৫ বছর পরও বাস্তবতা হলো—সিটি করপোরেশন দুটি হলেও মহানগর এখনো একটি। জনমানুষ, যানবাহন, পানি, ড্রেনেজ, বায়ুদূষণ, গণপরিবহন কিংবা জলাবদ্ধতা ইত্যাদি উত্তর-দক্ষিণ আলাদা করে কাজ করে না, করাও সম্ভব নয়।
সমস্যা আরও গভীর হয়েছে, কারণ নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন পানি, বিদ্যুৎ, গণপরিবহন, ভূমি উন্নয়ন ও আবাসন সেবার ওপর সিটি করপোরেশনের তেমন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরে অর্ধশতাধিক সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করছে। ফলে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বের ‘ওভারল্যাপ’ এবং জবাবদিহির সংকট প্রায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—সিটি করপোরেশনের হাতে সেবা প্রদানের দায়িত্ব আছে। কিন্তু পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত। আবার রাজউকের হাতে পরিকল্পনার দায়িত্ব আছে, কিন্তু নেই নগর সেবা প্রদানের দায়িত্ব। ফলে রাজউকের ড্যাপ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) আছে, কিন্তু জলাবদ্ধতা কমে না; ভবন অনুমোদন হয়, কিন্তু রাস্তা ও ড্রেনেজের সক্ষমতা বাড়ে না; মেয়র বা প্রশাসক আছেন, কিন্তু শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে নেই।
দুজন মেয়র ও দুই শতাধিক কাউন্সিলরের পদ সৃষ্টি করাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে আমাদের উচিত ছিল বিশ্বের সফল মেগাসিটিগুলোর পরিচালন কাঠামো থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকার জন্য একটি উপযোগী মহানগর পরিচালনব্যবস্থা গড়ে তোলা। লন্ডন, টোকিও বা সিউলের মতো শহরগুলো দেখিয়েছে—একটি মহানগরের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং শক্তিশালী আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ ১৭ বছর যেই লন্ডন মহানগরীতে বসবাস করেছেন, সেখানকার পরিচালনব্যবস্থা, লন্ডন সিটি করপোরেশন কীভাবে কাজ করে, মেয়র–কাউন্সিলরদের দায়িত্ব, কর্তব্য, ক্ষমতা কতটুকু, জনবলকাঠামো কেমন এবং সিটি করপোরেশন অন্যান্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করে ইত্যাদি বিষয়গুলোর থেকেও ঢাকার মতো বড় মহানগরীর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আমরা শিখতে পারি। এখন সময় আছে ঢাকার জন্য এমন একটি কার্যকর মহানগর সরকার–কাঠামো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু করার।
নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বনাম স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান
ঢাকার অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থ সমন্বয় মডেল কি আমরা এখন অন্য শহরগুলোতেও ছড়িয়ে দিচ্ছি? রাজউক ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৭ সালে রাজউক নামে পুনর্গঠিত হয়; এর মূল দায়িত্ব পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন অনুমোদন ও নগর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা। কিন্তু প্রায় ৭০ বছর পরও ঢাকা কি একটি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য, জলবায়ু-সহনশীল ও সমন্বিত মহানগর হিসেবে গড়ে উঠেছে—এ প্রশ্নের নির্মোহ উত্তর প্রয়োজন।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে, আর রাজউক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ফলে একই শহরে রাস্তা, ড্রেনেজ, খাল, ভূমি ব্যবহার, ভবন অনুমোদন, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য, উন্মুক্ত স্থান ও গণপরিবহন—সবই ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভক্ত। এর ফল হলো দায়িত্বের ‘ওভারল্যাপ’, জবাবদিহির ঘাটতি এবং নাগরিক সেবায় দীর্ঘস্থায়ী অকার্যকারিতা।
এ অবস্থায় চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কক্সবাজার, গাজীপুরের পাশাপাশি নতুনভাবে নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল ২০২৬ সংসদে পাস হয়েছে এবং সম্প্রতি আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান নিয়োগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—রাজউক মডেলের সাফল্য কোথায় মূল্যায়িত হয়েছে? যদি ঢাকা এখনো অপরিকল্পিত নগরায়ণের বলিদান হয়, অর্থাৎ জলাবদ্ধতা, যানজট, খাল-জলাশয় দখল, ভবন নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার সমন্বয় সংকটে ভোগে, তাহলে একই কাঠামো অন্য শহরে বিস্তার করার আগে স্বাধীন মূল্যায়ন, সংসদীয় শুনানি, পেশাজীবী বিতর্ক এবং স্থানীয় সরকারের মতামত নেওয়া কি প্রয়োজন ছিল না? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে গিয়ে বিদ্যমান সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে আরও দুর্বল করা হচ্ছে কি না, এর কি কোনো নির্মোহ মূল্যায়ন হয়েছে?
জেলা কি শুধুই প্রশাসনিক একক, নাকি স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্তর?
জেলা মূলত একটি প্রশাসনিক একক হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা, ভূমি প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে জেলা পরিষদ নামে একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তবে তার ক্ষমতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দ্রুত নগরায়ণ, আঞ্চলিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমন্বিত উন্নয়নের এই সময়ে জেলা কি শুধুই প্রশাসনিক একক হিসেবে থাকবে, নাকি এটি স্থানীয় সরকারের একটি শক্তিশালী স্তরে পরিণত হবে?
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক যোগাযোগ, আঞ্চলিক অর্থনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানিক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো জেলাপর্যায়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও বিনিয়োগ দাবি করে। ফলে জেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ও সমন্বয় স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশে জেলা বা সমজাতীয় মধ্যবর্তী স্তরের স্থানীয় সরকার আঞ্চলিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশেও যদি জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, পেশাদার জনবল এবং স্পষ্ট দায়িত্ব প্রদান করা যায়, তাহলে জেলা পরিষদ পরিকল্পিত নগর-অঞ্চল-গ্রামীণ উন্নয়নের একটি কার্যকর স্তরে পরিণত হতে পারে।
উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন: উন্নয়নের সুফল কি আসলেই প্রান্তিক জনমানুষের দোরগোড়ায়?
উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কারণ, উন্নয়নের সুফল সরাসরি প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব মূলত তাদের ওপরই ন্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নানা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং সম্পদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকলেও পরিকল্পনা প্রণয়ন, অর্থায়ন, জনবল নিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার বড় অংশ এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত।
অন্যদিকে অধিকাংশ উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ছাড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে স্থানীয় অগ্রাধিকারের চেয়ে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের শর্ত ও নির্দেশনাই অধিক গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং তথ্যপ্রযুক্তি জনবলের ঘাটতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পেশাদার পরিকল্পনা ও সেবা প্রদানের সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রকল্পভিত্তিক ও খাতভিত্তিক কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে স্থানীয় জনগণের চাহিদা ও অগ্রাধিকার সব সময় উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন উদ্যোগগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে সমন্বিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ফলে স্থানীয় সরকার জনগণের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানসমূহ এখনো স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারেনি।
জরুরি করণীয়
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ও উন্নয়ন–কাঠামোর একটি মৌলিক উপাদান। তাই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার, বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং অংশগ্রহণমূলক পরিচালন–সংক্রান্ত অঙ্গীকারসমূহ পর্যালোচনা এবং একই সঙ্গে এযাবৎকালে গঠিত সব স্থানীয় সরকারবিষয়ক কমিশন প্রতিবেদন এবং স্থানীয় সরকার কমিশন ২০২৫ পুনর্মূল্যায়ন করে বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে একটি আধুনিক, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা জরুরি।
এই কমিটিতে সংযুক্ত থাকবেন স্থানীয় সরকার ও লোকপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ, নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ পরিকল্পনাবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, আইনজীবী এবং অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা। এই কমিটি প্রণয়ন করবে একটি সমন্বিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কাঠামো, যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে রাজনৈতিক ঐকমত্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় নীতি ও আইনগত সংস্কার।
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান মুখ্য সমন্বয়ক, স্থানিক পরিকল্পনা ও সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।



