২০০১ সালের ২৬ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন হাজারী প্রথম আলো সম্পাদক, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বিষোদ্গার করেন। ফেনী-২ আসনের এই আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যের বক্তব্য তখন অনেককে হতবাক করেছিল।
টিপু সুলতানের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট
জয়নাল হাজারীর বক্তব্যের পটভূমি ছিল সংবাদ সংস্থা ইউএনবির তৎকালীন ফেনী প্রতিনিধি টিপু সুলতানের ওপর হামলা। ফেনীতে 'সন্ত্রাসের গডফাদার' হিসেবে পরিচিত জয়নাল হাজারীর অনুসারীরা টিপু সুলতানকে পিটিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফেলে রেখেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় প্রথম আলোসহ সংবাদপত্রগুলো নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার যৌথ তহবিল গঠন করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জয়নাল হাজারী সংসদে বলেন, 'এক সাংবাদিকের হাত ভেঙেছে বলে কত হইচই!'
কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও মিথ্যা অভিযোগ
বাজেট আলোচনায় অংশ না নিয়ে জয়নাল হাজারী প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। তিনি মিথ্যা দাবি করেন যে টিপু সুলতানের বোনকে প্রথম আলো সম্পাদকের বাসায় আটকে রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসার জন্য ২১ লাখ নয়, ২১ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রথম আলো নিজের বিনিয়োগ প্রতিস্থাপন করেছে। এ সময় সংসদে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুসহ জ্যেষ্ঠ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করলেও জয়নাল হাজারীকে থামাননি বা তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেননি।
জয়নাল হাজারী আরও বলেন, 'আমি জানি না, কেন আমরা আল্লাহর পরই সংবাদপত্রগুলোকে ভয় পাই। তথ্য প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীসহ আমাদের অনেকের বিরুদ্ধেই তারা যা ইচ্ছে খুশি লিখছে।' তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও আক্রমণ করে বলেন, 'এক টিপুর হাত ভাঙার পর বেগম খালেদা জিয়া টিপুকে দেখতে ছুটে গেলেন, অথচ নারায়ণগঞ্জে ২২ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও কেউ তাদের দেখতে যাননি।'
দেশজুড়ে নিন্দা-প্রতিবাদ
প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে জয়নাল হাজারীর অশোভন মন্তব্যে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি পালন করে এবং বিশিষ্টজনরা বিবৃতি দেন। ২৮ জুন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) জরুরি সভায় নিন্দা জানিয়ে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী, যিনি পরে ফেনী-২ আসনে সংসদ সদস্য ও তথ্য উপদেষ্টা হন। বক্তব্য রাখেন ইয়াসিন আহমদ, মাহফুজুল হক খান, আলতাফ মাহমুদ, আমিরুল মোমেনীন, মনজুরুল আহসান বুলবুল, শাহ আলমগীর, আবদুল জলিল ভুঁইয়া, মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।
২৯ জুন দেশের ১৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে জয়নাল হাজারীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, 'এ ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। কোনো ব্যক্তি বা সংবাদপত্র সম্পর্কে জয়নাল হাজারীর বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া থেকে থাকলে তা প্রকাশ করার বহু স্বাভাবিক ও আইনি পথ ছিল। সংসদে যে ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, তাঁর বিরুদ্ধে সংসদকে অপব্যবহারের এমন নজির খুবই দুঃখজনক।' বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, কবি শামসুর রাহমান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমান, সাবেক সচিব মো. মুজিবুল হক ও সাবেক সচিব ফারুক চৌধুরী।
স্পিকারের কাছে চিঠি ও বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
২৮ জুন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর কাছে চিঠি দিয়ে জয়নাল হাজারীর বক্তব্য এক্সপাঞ্জের আবেদন করেন। চিঠিতে তিনি বক্তব্যকে 'নির্জলা মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মানহানিকর' উল্লেখ করেন এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৭১ ধারা লঙ্ঘনের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
৪ জুলাই স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সংসদে ঘোষণা দেন যে জয়নাল হাজারীর প্রথম আলো সম্পাদক সম্পর্কিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'সংসদে কী সম্পর্কে, কার সম্পর্কে, কতটুকু কথা বলা যায়, কার্যপ্রণালি বিধিতে দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিধি অনুসারে সদস্যরা অগ্রসর না হলে আমাকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। সংসদ এবং সংবিধানই আমাকে সে ক্ষমতা দিয়েছে।'
এক্সপাঞ্জের আগে জয়নাল হাজারী পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন যে রাশেদ খান মেনন সংসদকে 'খিস্তিখেউড়ের স্থান' বলেছেন এবং তিনি আবারও প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে তার আগের বক্তব্য পুনরুক্ত করেন। স্পিকার জবাবে বলেন, 'আমি গালাগালি করি না, করতে জানি না। গালাগালির শব্দগুলো আপনারা ব্যবহার করেন।'
এক্সপাঞ্জের পরেও কুৎসা ও প্রতিবাদ
এক্সপাঞ্জের পরও একই দিনে জয়নাল হাজারী সংবাদ সম্মেলনে প্রথম আলোকে নিয়ে একই অসত্য তথ্য ও কুৎসা রটনা করেন। ৫ জুলাই প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বিবৃতিতে জয়নাল হাজারীর অভিযোগ নাকচ করে বলেন, 'তার প্রতিটি অভিযোগ নির্জলা মিথ্যা। এই মিথ্যা অভিযোগ প্রচার বন্ধ করতে হবে বলে দাবি জানাচ্ছি।' তিনি আরও বলেন, 'জনসাধারণকে সঠিক তথ্য জানানো ছাড়া প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। কারও কোনো হুমকিতেই প্রথম আলো এই পেশাগত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত হবে না।'
টিপু সুলতান বর্তমানে প্রথম আলোর হেড অব রিপোর্টিং হিসেবে কর্মরত। জয়নাল হাজারী ২০২১ সালে মারা যান, তখন তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন।



