জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মধ্যে দেশের ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তিনি জানান, এ সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো। এ কয়েক মাসে এই ঋণের পরিমাণ এখন ২৪ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসে আরও এক লাখ কোটি টাকা ঋণের জালে দেশকে বেঁধে ফেলেছে।
আইএমএফ ঋণ না পাওয়া ও সংস্কারের অভাব
আখতার আইএমএফের ঋণ চেয়ে না পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সরকারকেও জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে না পারি, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারি, আইএমএফের কাছ থেকে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে যেমন করে ফিরে আসতে হয়েছিল, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারি দলকেও জনগণের কাছ থেকে ফিরে আসতে হবে।’
বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে যুক্ত করে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, অর্থমন্ত্রীর ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যের দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সামাজিক কাঠামোর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সংস্কারের কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তিনি বাজেট বাস্তবায়নের সময় জনগণের রায় ও গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং যথাযথ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অর্থনৈতিক সংস্কার না হওয়ায় আইএমএফ ঋণ দেয়নি
অর্থনৈতিক খাতে সংস্কারের অভাবের কারণেই আইএমএফের ঋণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, আইএমএফ চেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতগুলোতেও একটা বড় ধরনের সংস্কার আসুক। অর্থনৈতিক খাতগুলোতে কোনো ধরনের সংস্কার হচ্ছে না। অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে কোনো ধরনের সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি সরকার ইতিবাচক নয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, এত দিনে এনবিআরের রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করার কথা সরকার বলছে। কিন্তু এই বিষয়টা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধ্যাদেশ পাস করা হয়। সেই অধ্যাদেশ এই সংসদে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সেই অধ্যাদেশটাকে কার্যকর করতে দেয়নি।
আখতারের ভাষায়, ‘যদি সরকার সেই সময়টাতে সংস্কারের বিষয়গুলোকে মেনে নিত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার হয়ে যেত, সে ক্ষেত্রে হয়তো বিদেশে গিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে খালি হাতে ফিরে আসতে হতো না।’
ব্যাংকিং খাতে ‘অরাজকতা’
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আখতার হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে একধরনের অরাজকতা চলছে। তিনি বলেন, শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, আরও পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। কিন্তু নতুন ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে আগের মালিকদের কাছে আবারও ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, এই আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের মালিকেরা যাঁরা আছেন, তাঁরা যদি সাড়ে ৭ শতাংশ টাকা ব্যাক করতে পারেন, তাহলে তাঁদের কাছে আবারও ব্যাংকের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এরপর প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রশ্ন হলো, যেসব মালিক এই ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, টাকা পাচার করেছে, এই ব্যাংকগুলোকে লুটপাট করেছে, সেই মালিকগুলোর কাছেই ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার ফায়দা কী হতে পারে?’
দেশের অর্থনীতি এখন ঝুপড়ির মতো
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, সেই শ্বেতপত্রে আওয়ামী লীগের সময়কালে ২৪০ বিলিয়ন ডলার, যেটা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার সমান, বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। তিনি বলেন, এত বিশাল পরিমাণ টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিটা এখন একটা ঝুপড়ির মতো। ঝুপড়িতে আসলে টাকাপয়সা নেই।
একই সঙ্গে এনসিপির সদস্য বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু অবস্থায় নিয়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি।’
বাজেটের আগেই দাম বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে সরকার
বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি—সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার আগেই সরকার তার এই তিন মাসের সময়কালের মধ্যেই দুই দফায় বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। যখন বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়, তখন পরিবহন সেক্টরে যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়।
আখতার হোসেনের ভাষায়, সরকার বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর মেকানিজম শুরু করেছে।
সংস্কারের বিকল্প নেই
বাজেট, সংস্কার, ঋণ, ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি এবং গণভোটের রায়—সবকিছু মিলিয়ে সরকারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই।



