জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে দেশের ঋণের বোঝা ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বাড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সরকারের ঋণ ও সংস্কার প্রসঙ্গে আখতার
“মাত্র চার মাসের মধ্যে সরকার দেশকে অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝায় ফেলেছে,” তিনি বলেন।
গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া জনাদেশ বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিপির এই আইনপ্রণেতা বলেন, অর্থমন্ত্রী নিজেই তার বাজেট বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে ও সামাজিক ক্ষতি মেরামত করতে রাজনৈতিক সংস্কার অপরিহার্য। তবে আখতার অভিযোগ করেন, এই সংস্কার এগিয়ে নিতে সরকার সামান্য অগ্রগতিই দেখিয়েছে।
“জনগণ সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য ভোট দিয়েছে। কিন্তু সরকার এসব বিষয়ে কথা বলেনি,” তিনি বলেন।
আইএমএফ ও ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তা পেতে সরকারের ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি সতর্ক করে বলেন, সুশাসন, গণতন্ত্র ও সংস্কার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে একইভাবে জনগণের আস্থাও হারাতে পারে।
“সংস্কার বাস্তবায়ন করা না গেলে, ক্ষমতাসীন দলকে, অর্থমন্ত্রী যেভাবে আইএমএফ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল, সেভাবেই জনগণের কাছেও ফিরে যেতে হতে পারে,” তিনি বলেন।
আখতার সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন এবং সঠিক পর্যালোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অর্থপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কারের অভাবে আইএমএফ সহায়তা দেয়নি।
তার মতে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময় অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি ও ব্যবস্থাপনা শাখা পৃথকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর তা বাতিল করে দেয়। “সরকার যদি সেসব সংস্কার গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করত, তাহলে আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি হতে পারত এবং সম্ভবত অর্থমন্ত্রীকে বিদেশ থেকে খালি হাতে ফিরতে হতো না,” তিনি বলেন।
অর্থনীতির ভঙ্গুরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে সমালোচনা
এনসিপির এমপি ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন নিয়েও সমালোচনা করে পরিস্থিতিকে ‘বিশৃঙ্খল’ বলে বর্ণনা করেন। সম্প্রতি প্রণীত ব্যাংক রিজলিউশন আইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে বিপর্যস্ত ব্যাংকের মালিকরা নির্দিষ্ট আর্থিক শর্ত পূরণ করলে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। “যারা ব্যাংক দেউলিয়া করে দিয়েছে, টাকা পাচার করেছে ও প্রতিষ্ঠানগুলো লুট করেছে, তারা আবার সেগুলো ফিরে পেতে পারে। এমন মালিকদের কাছে ব্যাংক ফিরিয়ে দিয়ে কী লাভ হবে?” তিনি প্রশ্ন রাখেন।
আখতার আরও দাবি করেন, বড় আকারের মূলধন পাচার ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের শ্বেতপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, দেশ থেকে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার সমতুল্য, পাচার করা হয়েছে। “বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খড়ের কুঁড়েঘরের মতো। ভেতরে খুব কম টাকা অবশিষ্ট আছে,” তিনি বলেন, পাশাপাশি খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনও ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
তিনি ক্ষমতাসীন দলের সেই সব আইনপ্রণেতার সমালোচনা করেন যারা দাবি করেছিলেন যে বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়েনি। আখতারের মতে, সরকার ক্ষমতা নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম দুবার বাড়িয়েছে, যা পুরো অর্থনীতিতে দাম বৃদ্ধির সূত্রপাত করেছে। “বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বেড়ে যায় এবং সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাজেট ঘোষণার আগেই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চালু হয়ে গিয়েছিল,” তিনি বলেন।



