চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে মনজুর আলমের সম্ভাব্য প্রার্থীত্ব নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেন, এমন গুঞ্জন ঘিরেই নতুন করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে গত মঙ্গলবার নগরের কাট্টলী এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে সাক্ষাতের পর বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে।
এনসিপির প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা
মনজুর আলম এনসিপির প্রার্থী হতে পারেন কি না, এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা আলোচনা। যদিও দলটির নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না, তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ইঙ্গিত মিলছে যে বিষয়টি দলীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। গত রমজানে চট্টগ্রামে এনসিপির এক ইফতার মাহফিলে ব্যবহৃত পানির বোতলে ‘মনজুর আলমের সৌজন্যে’ লেখা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সেই ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবার এনসিপি নেতার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের অবস্থান
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনকে এগিয়ে রাখছেন নেতা–কর্মীরা। দল থেকে এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলে জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির প্রার্থীই হতে পারেন তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। জাতীয় পর্যায়ে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতা থাকায় স্থানীয় নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সে ক্ষেত্রে এনসিপি শক্ত প্রার্থী দিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনজুর আলম এনসিপির প্রার্থী হলে বিএনপির জন্য তা ‘চ্যালেঞ্জ’ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাতব্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় তাঁর ব্যক্তিগত একটি ‘ভোটব্যাংক’ রয়েছে। পাশাপাশি অতীতে আওয়ামী লীগের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ায় দলটির সমর্থকদের একটি অংশের সহানুভূতিও পেতে পারেন তিনি। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সমর্থন যদি তাঁর দিকে যায়, তবে সেটি তাঁর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
মনজুর আলমের বক্তব্য
সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মনজুর আলম বলেন, ‘সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরে তিনি আমার বাসায় বেড়াতে আসেন। এটি সৌজন্য সাক্ষাৎ, এর বেশি কিছু নয়।’ এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কোনো বিষয়েই আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়নি।’
এনসিপি ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের সমন্বয়কারী ও মিডিয়া সেলের প্রধান রিদুয়ান হৃদয় বলেন, এটি একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। মনজুর আলম এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নেই। স্থানীয় নির্বাচনে জোট থাকবে কি না, সে বিষয়েও কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহানও বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে যেহেতু দলীয় প্রতীক থাকে না, তাই এনসিপির সঙ্গে জোট হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই।
মনজুর আলমের রাজনৈতিক পটভূমি
মনজুর আলমের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। তাঁর বাবা আবদুল হাকিম কনট্রাকটর ছিলেন পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। নিজেও আওয়ামী লীগের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরে ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করে তিনি প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তবে ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকাণ্ডেও তাঁকে দেখা যায়।
সম্প্রতিক ঘটনাবলী
রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছেন মনজুর আলম। গত জানুয়ারির শেষ দিকে কাট্টলীর বাসার সামনে আয়োজিত এক সভায় তিনি বিএনপির পক্ষে ভোট চান। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠে, তিনি কি আবার বিএনপিতে সক্রিয় হচ্ছেন। এর আগে তাঁর অর্থায়নে বেগম খালেদা জিয়া জামে মসজিদ নির্মাণ, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও তাঁকে আলোচনায় আনে। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন মনজুর আলম। তবে ভোটের দিন তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। এর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ২০১৮ ও ২০২০ সালেও তিনি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মনোনয়ন পাননি।



