ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিতর্ক, ওয়াকআউট ও হাসির মুহূর্ত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে এই অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি উঠে এসেছে নানা ছোটখাটো ঘটনা, মন্তব্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। এসব টুকিটাকি বিষয় কখনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে, আবার কখনো তৈরি করেছে হাস্যরসের পরিবেশ। এদিন বিল পাস নিয়ে ফের ওয়াকআউট করে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। সংসদের এমনই কিছু উল্লেখযোগ্য টুকিটাকি ঘটনা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
হাসনাতের বক্তব্যকে রাজপথের জন্য ‘জুসি’ বললেন আইনমন্ত্রী
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাশের সময় আপত্তি তুলে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আজকে যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস করানোর কথা বলা হচ্ছে, এটির মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের কমিশনের আইনটি রিস্টোর করা হবে। ২০০৯ সালের যে আইনটি আছে, সে আইনের প্রয়োগ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে হয়েছে যা আমরা দেখেছি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নামে বিরোধী দল ও মতকে দমন কমিশন হিসেবে সেটি ব্যবহার করা হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “বিএনপিকে দমন করার বৈধতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন উৎপাদন করেছে। আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বলতে শুনেছি, জামাতের নেতাকর্মীদেরকে গুলি করা বৈধ। মানবাধিকার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমরা যদি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০০৯-এ চলে যাই, আজকে যদি ২০২৫ এর অধ্যাদেশটিকে ল্যাপস করে দেওয়া হয়, এটি সংসদের জন্য ফরোয়ার্ডিং মুভ ছিল। এর মধ্য দিয়ে জাতি আবার ব্যাকওয়ার্ডের দিকে যাবে। ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আদৌতে কোনও আইন না, এটা সরকারি আরেকটা দফতর বানানো হয়েছে।”
নতুন এই সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে সময়ের পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, “আজকে যদি ২০২৪ সালের মে মাস হতো, আর এই বিলটি যদি উত্থাপন হতো তাহলে এই সংসদের এমন একজন ব্যক্তি নাই যে এটার বিরোধিতা করতো। আজকে সময় পাল্টিয়েছে। ২০১৮ সালে আপনারা এই পাশে (বিরোধী দল) ছিলেন। আজকে ওই পাশে (সরকার) গিয়েছেন, আপনারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছেন। আজকে এই বিলের বিরুদ্ধে আপনারা অবস্থান নিচ্ছেন। আজকে সময় পাল্টিয়েছে, ঋতু পরিবর্তন হয়েছে, চেয়ার পরিবর্তন হয়েছে, দিক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিচ্ছি।”
হাসনাত আব্দুল্লাহর এই বক্তব্যের পরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান পাল্টা জবাবে বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্য খুব সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। উনার এই বক্তব্যগুলো পল্টন ময়দান, প্রেস ক্লাব বা রাজপথের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও ‘জুসি’। তবে, সংসদে বিল পাসের ক্ষেত্রে আইন গভীরভাবে পাঠ করা জরুরি। আমার মনে হয় উনি সব পড়েছেন, শুধু মূল বিলটা পড়েননি।”
মন্ত্রী ব্যাখ্যা করে বলেন, বিলের প্রথম লাইনেই বলা আছে— ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। এই সময়ে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম যাতে স্থবির না হয়ে পড়ে, সেই কারণেই আমরা সাময়িকভাবে ২০০৯ সালের আইনটি পুনঃপ্রচলন (রিস্টোর) করেছি। কেউ যেন বলতে না পারে যে বাংলাদেশে কোনো মানবাধিকার কমিশন নেই।
ওয়াকআউট করলো বিরোধী দল, ধন্যবাদ দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
তৃতীয়বারের মতো আজকে আবারও জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে আমরা তার দায় নিতে চাই না। তাই আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।”
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠেছি। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ফাস্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিং, সব রিডিংয়ে উনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও দিয়েছেন। সমস্ত প্রক্রিয়া অংশ নেওয়ার পরে ওয়াকআউটের কোনও মানে আছে কি না এটা জানার জন্য। সমস্ত প্রক্রিয়া তারা অংশ নিয়েছে এ জন্য ধন্যবাদ। আশা করি, মাগরিবের নামাজের পর তারা আবার অংশ নেবেন।”
প্রশাসকদের ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ বললো জামায়াত এমপি
নিজের বক্তব্য দেওয়ার সময় পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদেরকে ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ বলে মন্তব্য করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে নাজিবুর রহমান বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে দিয়ে অনির্বাচিত প্রশাসক ভবিষ্যতে বসানোর যে রাস্তাটা আছে সেটি খোলা হলো। আমরা দেখছি, এখন যেটা করা হচ্ছে...গত নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছিলেন তাদেরকে কন্সালেশন প্রাইজ বা সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ...আর কয়টার কথা বলবো মাননীয় স্পিকার। ময়মনসিংহ, কুমিল্লাও আছে।”
না ভোটের আওয়াজ বেশি, জিতেছে হ্যাঁ ভোট
সংসদে একটি বিল উত্থাপনের সময় না ভোট দেয় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। উচ্চ শব্দে না বলায় হেসে দেন সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বিরোধী দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য, আওয়াজ বেশি হচ্ছে। এই কারণে আমি হাসিও দিচ্ছি। কিন্তু, ভোটের দিক দিয়ে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে, আমার করার কিছু নাই। আপনাদের ‘না’ ধ্বনিটা জোরে হচ্ছে তাই আমি হাসি দিয়ে রেসপন্স করছি।”
এই ঘটনাগুলো সংসদের অধিবেশনে রাজনৈতিক বিতর্ক, বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও হালকা মেজাজের মিশেল তুলে ধরেছে, যা জনমনে আলাদা করে নজর কেড়েছে।



