জাতীয় সংসদে জামুকা বিল পাস: মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে তিন দলের নাম বহাল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংসদে এই বিল উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, যা কণ্ঠভোটে অনুমোদন লাভ করে।
জামায়াতের আপত্তি ও বিরোধী দলের অবস্থান
বিলটির বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানিয়ে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদে বক্তব্য দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই অধ্যাদেশ বর্তমান অবস্থায় পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে থেকে যাবে, যা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে জানিয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের নেতা কোনো আপত্তি করেননি উল্লেখ করে আপত্তি নিষ্পত্তিতে ভোট দেননি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও কোনো জবাব দেননি। পরে স্পিকার এনসিপির কোনো আপত্তি নেই বলে সংসদকে অনুরোধ করেন এবং বিলটি ভোটে দেওয়া হয়।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন ও জামায়াতের ভিন্নমত
সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) জানিয়ে বলেছিলেন, অধ্যাদেশটি পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে। তারা দাবি করেন যে, এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার আমলে আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন বলে উল্লেখ করা হয়।
অধ্যাদেশের সংজ্ঞা ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী’, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবার’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী বা ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্তকারী ব্যক্তিরা, যারা পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন।
এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ, পুলিশ বাহিনী, ইপিআর, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ’র সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শফিকুর রহমানের ঐতিহাসিক বক্তব্য
বিলটির ওপর আপত্তি জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চেয়েছিলেন দেশটা মানবিক হবে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, কিন্তু স্বাধীনতার পরে তার পুরোটাই উল্টোটা হয়েছিল। তিনি ১৯৭৫ সালে সংসদে মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ঘটনা উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, পঁচাত্তরের পর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে।
জামুকা আইনের সংজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, এ জিনিসটা স্বাধীনতার পরে তখনকার সরকার আনেনি, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আনেননি। এটি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত প্রতীক শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন, একাত্তরের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী।’
শফিকুর রহমান ১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম এবং সব দলের অধিকার ফিরে পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরাও (জামায়াতে ইসলামী) সে সময় ফিরে পেয়েছি।’ তিনি জাতিকে আর বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
পরিশেষে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিলটি ভোটে দেন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার বলেন, বিরোধী দলের নেতা তো কোনো আপত্তি করেননি। তখন মন্ত্রী বিলটি তোলার জন্য অনুরোধ করেন এবং বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।



