জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ সংশোধন বিল উত্থাপনের সময় 'বীর মুক্তিযোদ্ধার' সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে 'জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল-২০২৬'-এর ওপর আলোচনাকালে তিনি এই দাবি তোলেন।
আল্লাহই একমাত্র সাক্ষী: শফিকুর রহমান
শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, 'আল্লাহ ভালো জানেন ১৯৭১ সালের এই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহ তাআলা তার নিখুঁত পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী।' তিনি বিদ্যমান আইনের সংজ্ঞায় উল্লেখ করেন যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক দলের নাম বাদ দেওয়ার দাবি
বিরোধীদলীয় নেতা এই সংজ্ঞা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নাম বাদ দেওয়ার দাবি তুলে বলেন, 'মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম– এই তিনটি দলের নাম সংজ্ঞায় আনা হয়েছে। আমরা চাই বাংলাদেশ রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলুক। আমরা এই জাতিতে আর কোনো বিভক্তি চাচ্ছি না।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ বিলে যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে, স্বাধীনতার পরের শাসকরা তা আনেননি, এমনকি জিয়াউর রহমান বা পরবর্তী সরকারগুলোও এটি করেনি। এটি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন শেখ হাসিনা এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, 'যারা দেশ ও জাতির জন্য বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং মারা গেছেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।' তার বক্তব্যে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাকশালের ইতিহাস টেনে বলেন, ১৯৭৩-এর সংসদ মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশালের জন্ম দিয়েছিল। এরপর পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের হাতে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।
সংসদীয় প্রক্রিয়া ও স্পিকারের বক্তব্য
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আম খান। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার জানান, এ বিলের বিষয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (এনসিপি) কোনো আপত্তি জানায়নি এবং তারা লিখিতভাবে সংসদকে মতামত জানিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই বক্তব্য শেষ করে সংসদকে ধন্যবাদ জানান ডা. শফিকুর রহমান।
'বীর মুক্তিযোদ্ধা' সংজ্ঞার বিস্তারিত বিবরণ
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ এর সংজ্ঞায় 'বীর মুক্তিযোদ্ধা' অর্থ বলতে বলা হয়েছে– 'যাহারা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়াছেন এবং যে সকল ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাহাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের এই দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ করিয়াছেন, এরূপ সকল বেসামরিক নাগরিক উক্ত সময়ে যাহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে; এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই.পি.আর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইবেন। এছাড়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাহাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিত সকল নারীও (বীরাঙ্গনা) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত হবেন।'
এই আলোচনায় শফিকুর রহমানের বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের সূচনা করেছে, যা সংসদে উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



