বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিতর্ক: সংসদ বাতিল করলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় অধ্যাদেশ
সংসদ বাতিল করলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় অধ্যাদেশ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক: সংসদ বাতিল করলো সুপ্রিম কোর্টের অধ্যাদেশ

জাতীয় সংসদ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। 'সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল' এবং 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল' পাসের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিরোধী দল এই পদক্ষেপকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে উল্লেখ করলেও সরকার জোর দিয়ে বলেছে, তারা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং ভবিষ্যতে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।

অধ্যাদেশ বাতিলের প্রক্রিয়া ও প্রভাব

সংসদে পাস হওয়া বিল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইনে পরিণত হবে এবং সরকার গেজেট জারি করবে। এর ফলে:

  • সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আর কোনো পৃথক আইন থাকবে না। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির পরামর্শে বিচারক নিয়োগ দেবেন।
  • অধ্যাদেশের অধীনে ইতিমধ্যে নেওয়া ২৫ জন বিচারকের নিয়োগসহ অন্যান্য ব্যবস্থা বৈধ বলে গণ্য হবে।
  • সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে এবং এর বাজেট, প্রকল্প ও কর্মসূচি সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
  • সচিবালয়ের কর্মকর্তারা আগের আইনের অধীনে কাজ করবেন।

বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ

বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান ও আখতার হোসেন বিল পাসের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা। তারা উল্লেখ করেন, জুলাই সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ভিন্নমত দেয়নি, তাই এখন রহিতকরণ বিল আনা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। নাজিবুর রহমান আরও বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় অধ্যাদেশ জারি বৈধ ছিল, তাই বিলটি অসাংবিধানিক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনমন্ত্রীর জবাব ও সরকারের অবস্থান

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিরোধী দলের অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, কিন্তু অতীতে এই স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সুপ্রিম কোর্ট শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের জন্ম দিয়েছে এবং বিরোধী দলীয় নেতাদের সাজা দেওয়ার জন্য রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিচারকাজ করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বলেন, "আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক"—বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও যোগ করেন, সংসদকে আইন করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট ডিক্টেট করতে পারে না, এবং জুলাই সনদে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য বিশেষ কমিটিতে আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

অতীতে বিচারক নিয়োগের জন্য কোনো পৃথক আইন না থাকায় এবং রাজনীতিকীকরণের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে। এতে 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল' গঠনের বিধান ছিল, যা এখন বাতিল হলো। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ একটি স্বতন্ত্র সংস্থার হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল, সেটিও রহিত করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই পরিবর্তন বিচার বিভাগকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, তবে তারা দ্রুত নতুন ও স্বচ্ছ আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বিচারিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।