সংসদ অধিবেশনে বিসিবি ‘বাপের দোয়া বোর্ড’ মন্তব্য, আসন পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক
সংসদে বিসিবি ‘বাপের দোয়া বোর্ড’ মন্তব্য, আসন নিয়ে বিতর্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের একাদশতম দিনে উঠে এলো বিসিবি নিয়ে তীব্র মন্তব্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের একাদশতম দিনটি ছিলো আজ বুধবার (৮ এপ্রিল)। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হওয়া এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি উঠে আসে নানা ছোটখাটো ঘটনা, মন্তব্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত—যেগুলো জনমনে আলাদা করে নজর কাড়ে। এসব টুকিটাকি বিষয় কখনো বিতর্ক উসকে দেয়, কখনো তৈরি করে হাস্যরসের পরিবেশ। আজকের অধিবেশনে এমনই কিছু উল্লেখযোগ্য টুকিটাকি ঘটনা ঘটেছে, যা সংসদীয় আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিসিবিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বললেন হাসনাত আব্দুল্লাহ

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে আনা বিলের আপত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিয়ে তীব্র মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আজকে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণের লক্ষ্যে যে বিলটা আনা হয়েছে, সেই বিলে যদি আমরা দেখি, কমিশন বলতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বুঝানো হয়েছে। এখানে সংজ্ঞার মধ্যে ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার’ এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো একভাবে দেখা হবে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে যেই কার্যাবলিগুলো সংঘটিত হয়েছে, সেটাকে একভাবে দেখা হবে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও যোগ করেন, “সমস্যার জায়গাটা হচ্ছে, সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে যে ধরনের সংঘটিত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেটাকে কে ডিফাইন করবে? এই আইন অনুযায়ী মানবাধিকার কমিশন সেটাকে কিন্তু ডিফাইন করবে। অর্থাৎ, এই ইনডেমনিটিটা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপরে নির্ভর করবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের যে অধ্যাদেশ সেটা কিন্তু ইতোমধ্যে ল্যাপস করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশন যদি ২০০৯ সালের অনুযায়ী যদি চলে, তাহলে সেটা কিন্তু পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটা মানবাধিকার কমিশন। যেই মানবাধিকার কমিশন বিরোধী দল ও মতকে দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। ভিকটিম ব্লেমিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেই কমিশনে গুম-খুনের বৈধতা উৎপাদন করা হয়েছে।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে যেভাবে দখল করা হয়েছে, যেভাবে বিসিবিকে বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত করা হয়েছে…। এই অবস্থায় মানবাধিকার কমিশনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হলে নিরপেক্ষ কোনও অনুসন্ধান পাওয়া নিয়ে আমরা সন্দিহান।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব: ‘পান্তা ভাতে ঘি’

হাসনাত আব্দুল্লাহর এই মন্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “কিসের মধ্যে কি, পান্তা ভাতে ঘি।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা এখানে কোনও বাপের দোয়া, মায়ের দোয়া করিনি। এতদিন পর্যন্ত শুনতাম মায়ের দোয়া পরিবহন আছে, আজকে মাননীয় সদস্যের কল্যাণে শুনলাম বাপের দোয়া কমিটিও আছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিসিবির বোর্ড গঠন প্রসঙ্গে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা ক্ষমতা প্রয়োগ করে সারা বাংলাদেশের জেলা কমিটিগুলোকে প্রভাবিত করেছিল। বাংলাদেশের নিবন্ধিত ক্লাবগুলোর কাউন্সিলরদের প্রভাবিত ও সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং হাইকোর্টে করা রিটটি ঝুলিয়ে রেখে একতরফাভাবে বিসিবির বোর্ড গঠন করা হয়। তার প্রেক্ষিতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মাননীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর নেতৃত্বে অনিয়ম তদন্তে একটি কমিটি করে দেন। সেই কমিটি অনিয়ম খুঁজে পাওয়ার পর বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরপর দেশের কৃতি ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে প্রধান করে একটি অ্যাডহক কমিটি করা হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে এই অ্যাডহক কমিটি বিসিবির নির্বাচন আয়োজন করবে।”

প্রধানমন্ত্রীর পাশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন নিয়ে আপত্তি

পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পাশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তিনি বলেন, “আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, সংসদ নরম-গরম ইতিমধ্যে অনেকবার হয়েছে এবং আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য উনি সংবিধানের ধারা এবং কার্যপ্রণালীর ধারা সুন্দরভাবে বলেন। তো বিগত দু’দিন ধরে আমি উনাকে দেখছি যে উনার আসন যেখানে ছিলো সেখান থেকে উনি সর্বোচ্চ আসনের পাশে চলে গেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “জানি না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন বা তাকে কোনও বিশেষ ছাড় দিয়েছেন কিনা। যদি থাকে তাহলে মাননীয় স্পিকার এই সংসদের রুলস অফ প্রসিডিউর যা আছে এগুলোকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

এই বক্তব্যের পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সংসদের আসন পরিবর্তন হতেই পারে। এটা কোনও পয়েন্ট অফ অর্ডারের বিষয় না।”

স্পিকারকে ভুল করে ‘ভাই’ বলায় হাস্যরস

মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী বক্তব্য দেওয়ার সময় ভুল করে স্পিকারকে ‘ভাই’ সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, “ভাই আমাকে এক মিনিট সময় দেয়া যাবে?” পরে তিনি তার ভুল শুধরে আবার বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আমাকে এক মিনিট সময় দেওয়া যাবে?”

তার কথা হেসে দিয়ে স্পিকার বলেন, “ভাই যেহেতু বলেছেন তাহলে তো এক মিনিট সময়তো দিতে হয়। বলেন এক মিনিট।” এরপরেই স্পিকার তাকে বলেন, “ভাই-টাই বলবেন না।” এই ঘটনায় সংসদে হাস্যরসের পরিবেশ তৈরি হয়, যা অধিবেশনের কঠোর আলোচনার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।

সংসদের আজকের অধিবেশনটি এইসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও মন্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, যা রাজনৈতিক বিতর্ক ও হালকা মুহূর্তের মিশেলে একটি প্রাণবন্ত দিন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে।