গণতন্ত্রের ইতিহাসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই
গণতন্ত্রের ইতিহাসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইটি আসলে একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—দেশ কি শাসকের ইচ্ছায় চলবে, নাকি জনগণের অনুমোদিত আইনে? ইতিহাসের প্রাচীনকালে আইন ছিল শাসকের গোপন অস্ত্র, যেখানে রাজার মুখের কথাই আইনে পরিণত হতো। কিন্তু এই খামখেয়ালিপনা রুখতে মানুষ একদিন দাবি তুলেছিল যে আইনকে প্রকাশ্যে আনতে হবে।
ইতিহাসের মাইলফলক: হামুরাবি থেকে ম্যাগনা কার্টা
খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দে ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবি ২৮২টি আইন পাথরের স্তম্ভে খোদাই করে জনসমক্ষে স্থাপন করেছিলেন, যা ঘোষণা করেছিল যে ‘শাসক যেন যা খুশি তা করতে না পারে’। প্রায় তিন হাজার বছর পরে ১২১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা জনকে ‘ম্যাগনা কার্টা’য় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করেছিল যে রাজাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র একটিই: জনগণের উইলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শাসকের ইচ্ছাধীন আইন নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের গণভোট
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবলমাত্র একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের ‘সিস্টেম’ বা কাঠামো বদলের এক চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষাকে চূড়ান্ত আইনি রূপ দিতে ২০২৬ সালে আয়োজিত হয় এক ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটে জনগণ সরাসরি প্রয়োগ করে তাঁদের সার্বভৌম অভিপ্রায়, যেখানে ভোটারদের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল—তাঁরা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেন কি না?’
ব্যালট পেপারের সেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ কেবল একটি সনদ এবং বাস্তবায়ন আদেশই অনুমোদন করেননি, বরং তাঁরা প্রয়োগ করেছেন তাঁদের সর্বোচ্চ ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ বা কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার বা মেরামতের এক অলঙ্ঘনীয় সামাজিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা কোনো দলীয় ইশতেহারের চেয়ে ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকভাবে বহুগুণ শক্তিশালী।
গণভোটের বিশ্লেষণ: জনগণের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট
গণভোটের ব্যালট পেপারটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট চারটি সংস্কারের পক্ষে তাঁদের ম্যান্ডেট দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন
- ভোটের অনুপাতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, যেখানে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা যাবে না
- প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
- মৌলিক অধিকার, স্থানীয় সরকারসহ অন্যান্য সংস্কার
ব্যালট পেপারের ৩ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে; এই সংস্কারসমূহ বাস্তবায়নে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো ‘বাধ্য থাকিবে’। জনগণের এই স্পষ্ট নির্দেশনার অর্থ হলো—নির্বাচিত সরকার কেবল রুটিন কাজ করবে না, বরং তারা এই সংস্কারগুলো কার্যকর করার জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ: জুলাই সনদের আশার আলো অন্ধকারে?
জুলাই সনদের আশার আলো বর্তমানে অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যে হাজির হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যখন বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি স্বতন্ত্র কাউন্সিল গঠন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তখন আমরা আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান সরকার এখন এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি বাতিল করতে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে আলাদা বিচার বিভাগীয় সচিবালয় করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের অধ্যাদেশকেও রহিত করার জন্য তারা জাতীয় সংসদে বিল আনতে যাচ্ছে।
সেই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার–সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পাস না করার পেছনে যে খোঁড়া যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা বিগত ফ্যাসিবাদের আমলের দোহাইয়ের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। অথচ বিগত ফ্যাসিবাদী সময়ে তাদের দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীই গুমের শিকার, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের শিকার। এই সংস্কারগুলো থমকে যাওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে থাকা পুরোনো দলীয়করণের ভূতকে আবারও আমন্ত্রণ জানানো।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ বনাম সংসদীয় কমিটি
গণভোটের মাধ্যমে জনগণ বর্তমান সংসদকে একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের চূড়ান্ত ম্যান্ডেট দিয়েছিল। ম্যান্ডেট অনুযায়ী, এই পরিষদেরই দায়িত্ব ছিল জুলাই সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাবগুলো সংস্কার করে সংবিধানে তা স্থায়ী রূপ দেওয়া। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেছে। তারা গণভোটের গণরায়কে দলীয় অনুগতদের মাধ্যমে আদালতে পাঠিয়েছে এবং জনগণের দেওয়া ‘গাঠনিক ক্ষমতা’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও সেই কুখ্যাত ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর’ মতো সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান কাটাছেঁড়া করার পথে হাঁটছে।
জনগণ যেখানে চেয়েছে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সেখানে শাসকদল গণরায়কে পাশ কাটাতে সংসদীয় কমিটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি কেবল নীতিহীনতা নয়, বরং সরাসরি গণরায়ের অবমাননা এবং সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। যে সংসদ জনগণের ম্যান্ডেট দেওয়া ‘বাস্তবায়ন আদেশ’ উপেক্ষা করে, সেই সংসদের নৈতিক ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।
ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইতিহাস সাক্ষী, শাসক যখন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে এবং জনগণের ম্যান্ডেটকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তখনই তার প্রতি আর জনগণের সমর্থন থাকে না। ১২১৫ সালে রাজা জনও ম্যাগনা কার্টায় সই করার পর তা অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন, যা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশের নতুন শাসকদল যদি গণভোটের এই দলিল এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে, তবে তারা প্রকারান্তরে নিজেদের শাসনকেই অবৈধ করে তুলছে।
আইন যেন আর কখনো শাসকের হাতিয়ার না হয়ে জনগণের ঢাল হয়ে থাকে—২০২৬-এর গণভোটের ব্যালট পেপারটি সেই অঙ্গীকারেরই এক অমর দলিল। শাসকদল যদি আজ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পুরোনো নেশায় মত্ত হয়, তবে মনে রাখতে হবে—সার্বভৌমত্ব কোনো সরকারের নয়, বরং তা জনগণের। আর জনগণ যখন একবার তার ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ প্রয়োগ করে রায় দিয়ে দেয়, সেই রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাধ্য কোনো সংসদের নেই।
পরিশেষে, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে জনগণের সজাগ দৃষ্টিই হতে পারে এই ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট রক্ষার শেষ প্রাচীর। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত আর ২০২৬-এর গণভোটের মধ্য দিয়ে যে নতুন সামাজিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। নতুন বাংলাদেশের ম্যাগনা কার্টার পক্ষে যে গণরায় এসেছে, তা কোনো করুণা নয়—বরং জনগণের ‘সার্বভৌম অভিপ্রায়’ প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত অধিকার। এই অধিকার বাস্তবায়নে শৈথিল্য বা টালবাহানা বাংলাদেশকে আবারও সেই পুরোনো অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।



