বাংলাদেশে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়াতে ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার: ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব গ্রাফিক কার্ডে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর লোগো, ফন্ট, রং ও নকশা হুবহু নকল করা হচ্ছে, যাতে বানোয়াট তথ্যও সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং সুপরিকল্পিত। বিশ্লেষকদের মতে, জনমত প্রভাবিত করতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই কৌশলে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভুয়া ফটোকার্ডের পরিসংখ্যান ও ধরন
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে নয়টি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানের ৫৩৮টি রাজনৈতিক ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব। এসব প্রতিবেদনে মোট ৬৯০টি ভুয়া ফটোকার্ড শনাক্ত করা হয়েছে। এর অনেকগুলোই আমার দেশ, কালের কণ্ঠ ও যমুনা টেলিভিশন-এর মতো সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে তৈরি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক পক্ষগুলো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেখাতে এসব ফটোকার্ড ব্যবহার করেছে।
ভুয়া ফটোকার্ডের ধরন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এগুলো মূলত দুই ধরনের—সংবাদের আদলে তৈরি ও বানোয়াট উদ্ধৃতি বা বক্তব্যভিত্তিক। এর মধ্যে ৫১.৭ শতাংশ কার্ড সংবাদের আকারে তৈরি; যেখানে গ্রেপ্তার, অপরাধ, অভিযান বা জনমত জরিপের নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। বাকি ৪৮.৩ শতাংশে বিভিন্ন ব্যক্তি বা নেতার নামে বানানো বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সময়কাল
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ ধরনের ফটোকার্ডের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে এবং ডিসেম্বরের পর তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণার সময় জানুয়ারিতে এই প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটলেই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভুয়া ফটোকার্ডের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। নির্বাচনের আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়। বিভিন্ন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, ভোট কেনার সময় নেতা-কর্মীরা আটক হয়েছেন, এমন মিথ্যা তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
সবচেয়ে বেশি ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার হয়েছে রাজনৈতিক আক্রমণের উদ্দেশ্যে, প্রায় ৬২ শতাংশ। এ ছাড়া ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অভিযোগ তোলা হয়েছে। ১২.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের নকল ও রাজনৈতিক সমর্থকদের ভূমিকা
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব ফটোকার্ডে সবচেয়ে বেশি নকল করা হয়েছে আমার দেশ-এর ফটোকার্ডের নকশা। মোট ১৪৮টি ভুয়া ফটোকার্ডে এই সংবাদমাধ্যমের দৃশ্যমান পরিচয় বা ‘ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি’ নকল করা হয়েছে। এ ছাড়া কালের কণ্ঠ, যমুনা টেলিভিশন, আরটিভি ও কালবেলা-র আদলেও ব্যাপক কার্ড তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেও ব্যবহারের ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপি সমর্থক পেজগুলোতে আমার দেশ, যমুনা টিভি ও বিবিসি বাংলা-র আদল বেশি দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক পেজগুলোতে কালের কণ্ঠ, আরটিভি ও প্রথম আলো-র নকশা বেশি ব্যবহার হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সমর্থক পেজগুলোতে একাত্তর, যুগান্তর ও সমকাল-এর আদল নকল করার প্রবণতা বেশি পাওয়া গেছে বিশ্লেষণে।
দল ও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অপতথ্য
রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীকে সবচেয়ে বেশি ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। দলটিকে নিয়ে শনাক্ত হওয়া ২৮১টি অপতথ্যের মধ্যে ২৪৬টি ছিল নেতিবাচক। একইভাবে বিএনপিকে নিয়ে ২১২টি অপতথ্যের মধ্যে ১৯৭টি ছিল নেতিবাচক। নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) প্রায় সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচক ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যেখানে জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক শক্তি অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁকে নিয়ে ৭৮টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত আমির শফিকুর রহমানকে নিয়ে ৬১টি ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে ২১টি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রধানদের পাশাপাশি ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও এই অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমকে লক্ষ্য করে ২০টি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ১৯টি মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়।
যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও সাম্প্রদায়িক অপতথ্য
অন্তত ৩৪টি ক্ষেত্রে নারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বানোয়াট অভিযোগ, এমনকি হুমকিও ছড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পাঁচটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতায় ঝুঁকি ও প্রতিক্রিয়া
ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের আদলে তৈরি এসব ভুয়া ফটোকার্ডের প্রভাব কেবল অপতথ্য ছড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিণাম আরও সুদূরপ্রসারী। প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের দৃশ্যমান পরিচয় বা ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি নকল করার মাধ্যমে এই কার্ডগুলো শুধু পাঠকদেরই বিভ্রান্ত করছে না, বরং যেসব প্রতিষ্ঠানকে তারা অনুকরণ করছে, তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
দৈনিক আমার দেশ-এর সহযোগী সম্পাদক আলফাজ আনাম ডিসমিসল্যাবকে বলেন, এই প্রবণতা মূলধারার সাংবাদিকতার ওপর জন–আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা স্ক্রল করার সময় সাধারণত তথ্যের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেন না। প্রায়ই তাঁরা পরিচিত লোগো বা রঙের বিন্যাস দেখেই তথ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। কিন্তু পরে যখন তাঁরা বুঝতে পারেন যে তথ্যটি মিথ্যা ছিল, তখন তা সংবাদপত্রের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে; মানুষ ভাবতে শুরু করে যে আমরাই হয়তো ভুয়া খবর বা অপতথ্য প্রকাশ করছি।’
সংবাদমাধ্যমগুলো এখন এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। প্রথম আলো-র হেড অব অনলাইন প্রধান শওকত হোসেন ডিসমিসল্যাবকে জানান, তাঁদের সংবাদপত্রের নামে যখনই কোনো ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁরা নিয়মিত সেটির স্পষ্টীকরণ বা সতর্কতামূলক পোস্ট দেন। তিনি বলেন, ‘যখনই আমাদের নজরে এ ধরনের ফটোকার্ড আসে, আমরা তখনই আমাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করি। সেখানে জানানো হয় যে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টটি আমাদের নয় এবং পাঠকদের অনুরোধ করা হয় যেন তাঁরা তথ্যের জন্য আমাদের অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভর করেন।’



