সংসদে অনুমোদন পাচ্ছে না অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০টি অধ্যাদেশ
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির জারিকৃত সর্বমোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি চলতি সংসদ অধিবেশনে অনুমোদন পাচ্ছে না। সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে, যা গত বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
বিশেষ কমিটির সুপারিশ ও ভিন্নমত
বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের উপস্থাপনায় প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপন করা হোক।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ সম্পূর্ণ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দিয়েছেন, যা কমিটির সিদ্ধান্তে বৈচিত্র্য এনেছে।
সংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও সময়সীমা
সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির জারিকৃত অধ্যাদেশসমূহ সংসদের অধিবেশন বসার পর প্রথম বৈঠকেই উত্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
এই বিধান অনুসারে আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ আইন আকারে সংসদে পাস না হবে, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদি বা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে মোট ২০টি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর পরিণতি
যেসব অধ্যাদেশ পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ২০২৪ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ
- গণভোট অধ্যাদেশ
- গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ
- দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ
- রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ
এসব অধ্যাদেশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের ভিন্নমত রয়েছে, যা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
হুবহু পাসের সুপারিশকৃত অধ্যাদেশ
বিশেষ কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ
- বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৪
- সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ
- বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কতিপয় আইন সংশোধন অধ্যাদেশ
এসব অধ্যাদেশের বেশ কয়েকটিতে নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিধান রয়েছে, যা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
সংশোধিত আকারে উত্থাপনের সুপারিশ
১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে বিল তোলার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ
- সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ
- ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংশোধন করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল, যা সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ পেয়েছে। তবে কী সংশোধন করা হবে, তার স্পষ্ট উল্লেখ প্রতিবেদনে করা হয়নি।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী ভিন্নমত দিয়েছে, যা এই অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আগামী রবিবার থেকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যেন সুপারিশকৃত অধ্যাদেশগুলো পাসের জন্য বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করেন, সে জন্য অনুরোধ করেছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো বিল পাস না করার সুপারিশকে আশ্চর্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন, যা সংসদে আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।



