জামায়াত এমপির উপস্থিতিতে নেত্রকোনায় স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়কট
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফার উপস্থিতির প্রতিবাদে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা বয়কট করেছেন। বৃহস্পতিবার জগত মনি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ ও অবস্থান
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা-৫ আসনের জামায়াত এমপি মাসুম মোস্তফা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার খবর পেয়ে পূর্বধলার মুক্তিযোদ্ধারা আগেই প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য মো. রাজিবুল ইসলাম রাজীব বলেন, 'আমরা স্পষ্ট জানিয়েছিলাম, জামায়াতের এমপি থাকলে আমরা কেউ অনুষ্ঠানে যাব না। তিনি চলে যাওয়ার পরই আমরা অংশগ্রহণ করেছি।' এই বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ় প্রতিবাদের ইঙ্গিত বহন করে।
পূর্বধলা উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. নিজাম উদ্দিন আরও ব্যাখ্যা করেন, 'আমাদের কমান্ডারের নির্দেশ ছিল বয়কট করার। জামায়াতকে আমরা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে দেখি, তাই তাদের উপস্থিতিতে আমরা কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারি না।' এই মন্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক বিভাজনের গভীরতা ফুটে উঠেছে।
প্রশাসন ও এমপির প্রতিক্রিয়া
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুর রহমানের বর্ণনায়, 'আমরা প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করেছিলাম। জামায়াত এমপি আসার খবর পেয়ে আমরা অনুষ্ঠানে যাইনি। পরে তিনি চলে গেলে প্রশাসনের অনুরোধে আমরা পরবর্তী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সম্মাননা গ্রহণ করি।' এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসনিম জাহান বলেন, 'সব মুক্তিযোদ্ধা নন, কয়েকজন সকালের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। কুচকাওয়াজ শেষে তারা সবাই যোগ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মূল অনুষ্ঠানে এমপি উপস্থিত ছিলেন না।' তার বক্তব্যে অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ও অংশগ্রহণের পরিস্থিতি স্পষ্ট করা হয়েছে।
এমপি মাসুম মোস্তফা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির একটি অংশ আমার অংশগ্রহণে আপত্তি জানিয়েছিল। আমি প্রশাসনকে আগেই বলেছিলাম সব কর্মসূচিতে অংশ নেব। তবে একটি গ্রুপ বয়কট করায় পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি তাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিনি।' তার এই ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক সংঘাত ও সমঝোতার চেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
এই ঘটনা নেত্রকোনায় স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ঐতিহাসিক বিভাজনের ছায়া ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়কট শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের ভূমিকা, এমপির উপস্থিতি, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে এই ঘটনা জাতীয় সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে।
উপজেলা পর্যায়ের এই অনুষ্ঠানটি দেখিয়েছে যে, স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় উৎসবেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রকট হতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের এই সক্রিয় প্রতিবাদ বাংলাদেশের সমাজে তাদের মর্যাদা ও ভূমিকার প্রতি আলোকপাত করে, পাশাপাশি জামায়াতের মতো দলের উপস্থিতি নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও শাণিত করে।



