গফরগাঁওয়ে বালু উত্তোলন বিরোধে উত্তেজনা: সাত মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে গ্রামবাসী
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘর্ষের জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে গ্রামবাসী ছাত্রদল নেতা মুক্তার হোসেনের অনুসারীদের অন্তত সাতটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাটি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সরকারি কলেজসংলগ্ন চরআলগী এলাকায় সংঘটিত হয়েছে।
সংঘর্ষের পটভূমি ও পদচ্যুতি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের চরআলগী মৌজায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মুক্তার হোসেনের লোকজন সেখানে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা শুরু করলে, স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র আপত্তি জানান। গত বুধবার এ নিয়ে মুক্তার হোসেনের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মুক্তার হোসেনের অনুসারীরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে স্থানীয় নৌকার মাঝি ওয়াইজ উদ্দিনকে মারধর করেন এবং তার নৌকায় আগুন ধরিয়ে দেন।
খবর পেয়ে গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ছাত্রদল কর্মীদের ধাওয়া দেন। পালানোর সময় তারা মোটরসাইকেল ফেলে রেখে যায়। সরকারি কলেজের সামনের সড়কে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী সেই মোটরসাইকেলগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেন। গফরগাঁও উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি আবদুল কাইয়ুম বলেন, "মুক্তার নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলেন, যার ফলে নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। গতকালের কথা-কাটাকাটির পর আজ তার লোকজন মাঝিকে মারধর করে নৌকা পুড়িয়ে দিলে লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।"
ছাত্রদলের পদচ্যুতি ও পুলিশি বক্তব্য
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তার হোসেনকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়কের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে মুক্তার হোসেনকে পদচ্যুত করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
এদিকে, গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, "ব্রহ্মপুত্র নদের বালু নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধে ছয়-সাতটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা মুক্তার ও তার লোকজনকে ঘটনাস্থলে পাইনি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো পক্ষ থেকে এখনও অভিযোগ পাওয়া যায়নি।" মুক্তার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
স্থানীয় উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই ঘটনা গফরগাঁও এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা দাবি করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের নদীভাঙন ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা পরিবেশগত ও কৃষিজমির জন্য হুমকিস্বরূপ। তারা সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অন্যদিকে, ছাত্রদলের পদচ্যুতি সত্ত্বেও এলাকায় উত্তেজনা রয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। পুলিশ নজরদারি বাড়িয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
এই সংঘর্ষ শুধু স্থানীয় বিরোধই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, অন্যথায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। গফরগাঁওয়ের বাসিন্দারা আশা করছেন, এই ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং নদী রক্ষায় টেকসই সমাধান বের করবে।



