মামুন খালেদের দাবি: এক–এগারো পর প্রধানমন্ত্রী তারেকের জামিনে ভূমিকা রেখেছি
মামুন খালেদ: প্রধানমন্ত্রী তারেকের জামিনে ভূমিকা রেখেছি

সাবেক সেনা কর্মকর্তার বক্তব্যে নতুন মাত্রা

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ আদালতে একটি চমকপ্রদ দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ২০০৭ সালের ১/১১–পরবর্তী সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিন হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন।

রিমান্ড শুনানিতে উঠে এলো দাবি

জুলাই অভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলায় মামুন খালেদকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই রিমান্ড শুনানিকালে তিনি এই দাবি তুলে ধরেন। মামুন খালেদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এক–এগারোর সময় তখন আমি কুমিল্লায় ছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক সাহেবের জামিনের সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’

তারেক রহমানের কারাবন্দী হওয়ার পটভূমি

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির মামলায় আটক হন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান। প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দী থাকার পর তিনি মুক্তি পান। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। গত ডিসেম্বরে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মামুন খালেদের গ্রেপ্তার ও আদালত কার্যক্রম

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা মামুন খালেদকে গতকাল বুধবার রাতে ঢাকার বাসা থেকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আজ তাঁকে আদালতে হাজির করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেলা ২টা ৬ মিনিটে মামুন খালেদকে ঢাকার সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে হাজতখানায় রাখা হয়। এর ৫০ মিনিট পর তাঁকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিদ্দিক আজাদের আদালতে তোলা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক কফিল উদ্দিন তাঁর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের তালিকা

রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন:

  • ছাত্র আন্দোলনের সময় মামুন খালেদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়, যেখানে দেলোয়ার নামে একজন নিহত হন
  • তিনি এক-এগারোর সময়ের কুশীলবদের একজন ছিলেন এবং তখন ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন
  • সে সময় তিনি ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের বন্দী করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং হেনস্তা করেন
  • পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে যাঁরা সহযোগিতা করছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন
  • পুরস্কারস্বরূপ তিনি ডিজিএফআইয়ের প্রধান হন এবং আয়নাঘর (গোপন বন্দিশালা) তৈরি করেন
  • সেখানে অত্যাচার, গানপাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ নানা অপরাধ করেন
  • ডিজিএফআইকে রাজনৈতিকীকরণের কুশীলব তিনি
  • জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন
  • তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে এককাপড়ে বের করে দেন

আসামিপক্ষের যুক্তি ও পাল্টা বক্তব্য

আসামিপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন ও নজরুল ইসলাম রিমান্ড আবেদন বাতিল করে মামুন খালেদের জামিন আবেদন করেন। তাঁদের প্রধান যুক্তিগুলো হলো:

  1. এ মামলার এজাহারে মামুন খালেদের নাম নেই
  2. বাদী সেখানে নির্দিষ্টভাবে আসামিদের নাম বলে দিয়েছেন
  3. উচ্চ আদালতের আদেশে বলা আছে, যেকোনো মামলা হতে হলে নির্ভরযোগ্য চারটি কারণ থাকতে হবে, তার একটিও রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি
  4. মামুন খালেদ ওই সময় একজন চাকরিজীবী ছাড়া আর কিছু ছিলেন না
  5. তিনি ২০১৬ সালে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষ করেছেন
  6. তিন যুগের বেশি সময় তিনি পাঁচটি পদে চাকরি করেছেন এবং একটি পদেও আইনবহির্ভূতভাবে সুবিধা নেননি
  7. আয়নাঘরের দায়িত্বে তিনি ছিলেন না
  8. আওয়ামী লীগ সরকার পতনের বহু আগে তিনি অবসরে গেছেন
  9. খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদের সময় মামুন খালেদ তাঁর নিজের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন

মামুন খালেদের সরাসরি বক্তব্য

আদালতের অনুমতি নিয়ে সরাসরি কথা বলেন আসামি মামুন খালেদ। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন: ‘এক–এগারোর সময় তখন আমি কুমিল্লায়। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক সাহেবের জামিনে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছি।’

জলসিঁড়ি প্রকল্পের অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি বলেন, ‘জলসিঁড়ি প্রকল্পের টাকার যে অভিযোগ, সেটি হচ্ছে—নজরুল সাহেব নামে একজনের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব আমাকে দেন। আমি শুধু উদ্ধারের কাজে ছিলাম।’

আয়নাঘরের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ‘আমার সময়কালে (গুমের) কোনো অভিযোগ নেই।’ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিউইপি) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছিলেন উল্লেখ করে মামুন খালেদ আরও বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় সেখানকার শিক্ষার্থীরা উৎসাহিত হয়। এমনকি এ মামলার অভিযোগে যে জায়গার কথা বলা হয়েছে, ওখানে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ, ডিওএইচএসের বাইরে যাই নাই। ২৪ সালে আমার কথামতো কে গুলি করবে? তখন আমি সিভিলিয়ান।’

আদালতের চূড়ান্ত রায়

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক মামুন খালেদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের মক্কেলের ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। জবাবে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘ফ্যাসিস্টের সময় তারাই সব সুযোগ–সুবিধা পেয়েছে। সব করেছে তাঁরা।’

এই মামলাটি রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে মামুন খালেদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিনে ভূমিকা রাখার দাবিটি নিয়ে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমই নির্ধারণ করবে এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি।