স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা: মুক্তিযোদ্ধার হতাশা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বিচ্ছিন্ন সংঘাত
স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা: হতাশা, প্রতিশ্রুতি ও সংঘাত

স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা: মুক্তিযোদ্ধার হতাশা ও নতুন আশার আলো

‘যখন যুদ্ধে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম নিজেদের দেশ হবে, নিজেদের গণতান্ত্রিক শাসন হবে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন হবে। ৫৫ বছর কেটে গেলো, এখনও সেই আশায় বেঁচে আছি। পেছনে তাকালে মনে হয় এখনও শূন্যেই দাঁড়িয়ে আছি, নতুন করে শুরু করতে হবে। তবে তরুণ প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে, এবার আমরা পারবো।’ হতাশা আর এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে এভাবেই নিজের মনোভাব তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান। স্বাধীনতা দিবস পালন করতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসেছিলেন তিনি।

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও একই সুর

শুধু আব্দুর রহমান নন, দিনব্যাপী উদযাপনের ক্ষণে ক্ষণে শ্রদ্ধা জানাতে আসা নানা বয়সী ও শ্রণিপেশার মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সবার মধ্যেই যেন এক সুর ধ্বনিত হয়। পেছনের হতাশা ও আক্ষেপ ছাপিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ পায়। দিনভর বর্ণিলভাবে মহান স্বাধীনতা দিবস পালনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মনোভাব তুলে ধরেন অনেকে।

রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা ও বিরোধী দলের উপস্থিতি

বৃহস্পতিবার সকালে প্রথম প্রহরে স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। তাদের রাষ্ট্রীয় সালাম জানায় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। রাষ্ট্রের শীর্ষ দুই ব্যক্তির শ্রদ্ধার পর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপর্থী ব্যক্তিবর্গ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরুর পর প্রথমবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসে শ্রদ্ধা জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা। বেদির সামনে গিয়ে মোনাজাত করেন জামায়াত নেতারা। উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। বেদি ত্যাগ করার পর জামায়াত আমির এই আগমনকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা একটা নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। এটি রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আচার, সকলের মতো আমরা শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলাম।’

জনতার ঢল ও ব্যক্তিগত অনুভূতি

রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানানোর পর স্মৃতিসৌধ সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় জাতীয় স্মৃতিসৌধে নামে জনতার ঢল। লাল-সবুজের পতাকা হাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। আসে রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, সরকারি, বেসরকারি, সামাজিকসহ নানা সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের খণ্ড খণ্ড মিছিল।

আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকা থেকে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ফুল দিতে আসা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের কারণে দেশ পেয়েছি। তাই শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি।’ ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শোয়াইব রহমান বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আজ নানা জায়গায় হুমকির মুখে। স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালন। তাই এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যেন একটু বেশিই আবেগ অনুভব করছি।’

রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতি ও হুঁশিয়ারি

এদিন শ্রদ্ধা জানাতে এসে সত্যিকার অর্থে একটা সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা অত্যন্ত সাহসী বোধ করছি, আজকে আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেব নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিচ্ছি।’

মানুষকে সুবিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা-একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, সত্যিকারের স্বাধীন বাংলাদেশ। মানুষের প্রত্যাশা হলো-আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, সুশাসন থাকবে এবং মানুষ সুবিচার পাবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার অনেক আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হয়নি। পূরণ হয়নি বলেই আমাদের নতুন প্রজন্মকে আবারও রক্ত দিতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। আমরা চাই যে সামনে যাতে আর এমন না হয়।’ এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে টালবাহানা করা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’

জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ

জামায়াতের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর প্রতিবাদ জানান অনেকে। আম জনতা দলের সদস্যসচিব মো. তারেক রহমান বলেন, ‘এবার রাজাকাররা স্মৃতিসৌধে আসছে। এইটা মনে হচ্ছে যে আমরা একটা লজ্জাজনক অবস্থায় পড়ে গেছি।’ ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির ১৯৭১ সালের বিতর্কিত ভূমিকা অস্বীকার করে এবং জাতির কাছে ক্ষমা না চেয়ে উল্টো একটি নতুন বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।’

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনও অধরা

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে এসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেনের (প্রিন্স) মুখে উঠে এলো হতাশা ও ক্ষোভের কথা। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরও গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ নিয়ে কোনও প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু আমরা যা আজকে দেখছি, তা হলো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থান।’

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক একটা রাষ্ট্রের জন্য লড়তে লড়তে ৫৫ বছর আমরা পার করেছি। ৫৫ বছরও একটা স্বাধীন জনগোষ্ঠী হিসেবে দেশ আমরা কিন্তু সবালোকত্ব অর্জন করতে পারিনি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে প্রক্লেমেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স যেটা স্বাধীনতার ঘোষণা, সাম্য মানবিক মর্যাদা সামাজিক ন্যায়বিচার। ৫৫ বছরও সেটা আমরা অর্জন করতে পারিনি।’

বিচ্ছিন্ন সংঘাতের ঘটনা

মহান স্বাধীনতা উদযাপনকালে ঘটে একাধিক বিচ্ছিন্ন ঘটনাও। দুপুরের দিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক নারীসহ দুজনকে আটক করে পুলিশ। যদিও আটকের পর প্রত্যেকেই দাবি করেছেন তারা আওয়ামী লীগ বা এর কোনও সহযোগী সংগঠনের পদে নেই। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি ভালোবাসা থেকে তারা স্মৃতিসৌধে এসেছিলেন।

এর আগে সকালে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের আগ মুহূর্তে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে লাইনে অপেক্ষমাণ থাকাকালীন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জাতীয় পার্টির একজন নেতা আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

জাতীয় পার্টির মিছিলে এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির হামলা, তিন সন্তানকে নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে ফুল দিতে আসা আর ফোন চোরকে ধাওয়া করে পেটানোর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটে। প্রথমবার শ্রদ্ধা জানাতে আসে জামায়াতে ইসলামী, আর এই ঘটনাকে লজ্জা উল্লেখ করে দেওয়া হয় স্লোগান।