১৯৭১ সালের ২২ মার্চ: ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে 'জয় বাংলা' স্লোগানে উত্তাল জনসমুদ্র
১৯৭১ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে 'জয় বাংলা' স্লোগানে মিছিলের ঢল নামে। লাখো জনতা তাদের নেতার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়ে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বক্তৃতা
বাসভবন থেকে জনতার উদ্দেশে শেখ মুজিবুর রহমান বেশ কয়েকবার বক্তৃতা দেন। জনতার গগনবিদারী স্লোগান ও করতালির মধ্যে তিনি ঘোষণা করেন, 'সাত কোটি বাঙালি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন আমি অবশ্যই দাবি আদায় করে ছাড়ব।' অন্য একটি বক্তৃতায় তিনি বলেন, '২৩ বছর মার খেয়েছি, আর মার খেতে রাজি নই। শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না। প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব, কিন্তু এবার বাংলার দাবি আদায় করব।'
দৈনিক পত্রিকাগুলো পরদিন সেই খবর প্রকাশ করে উল্লেখ করে যে, একদিনে এত বড় মিছিল এর আগে কখনও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যায়নি। এই ঘটনা বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিকে ত্বরান্বিত করে।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পদক্ষেপ
এদিকে একই দিনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তানের দুই অংশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে 'ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি' করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বৈঠক ও আলোচনা
সকালে প্রেসিডেন্ট ভবনে এক ঐতিহাসিক বৈঠক হয়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। সোয়া এক ঘণ্টার বৈঠকের পর শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, 'আমাদের আন্দোলন চলছে। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।'
দুপুরে কড়া সামরিক পাহারায় হোটেলে ফিরে ভুট্টো তার উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করেন। হোটেলের বাইরে ভুট্টো-বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতা স্লোগান দেন। সন্ধ্যায় পিপলস পার্টির নেতারা প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন। ভুট্টো সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগ প্রধান এক সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, তবে তা পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়াই কার্যকর হবে না।
বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সাবেক বাঙালি সৈনিকদের সমাবেশ
বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সাবেক বাঙালি সৈনিকদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের সম্পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে।
ঢাকার পত্রিকাগুলোর বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ
ঢাকা পত্রিকাগুলো 'বাংলার স্বাধিকার' শিরোনামে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের বাণী ছাড়াও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহানের প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হয়। মূল পরিকল্পনায় ছিলেন নাট্য আন্দোলনের কর্মী রামেন্দু মজুমদার।
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী লিখেন, ঢাকার কয়েকটি পত্রিকায় এদিন 'বাংলার স্বাধিকার' শিরোনামে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়। ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হয় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি বাণী। ওই ক্রোড়পত্রে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রবন্ধ লেখেন। অবজারভার গ্রুপের পত্রিকাগুলো সেদিন এই ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেনি, তারা পরদিন ছাপে।
এই দিনের ঘটনাবলি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার জনতা তাদের দাবি আদায়ের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ওঠে।



