গত কয়েক মাস ধরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এক গভীর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ, গণবাস্তুচ্যুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পতনের পরও এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলো স্থবির হয়ে পড়েছিল। এই অচলাবস্থার মধ্যে গত মে মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত ও বর্তমান ‘বোর্ড অব পিস’-এর গাজাবিষয়ক উচ্চপ্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ ১৫ দফার একটি নতুন রূপরেখা উপস্থাপন করেন। এটি গাজায় স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও পুনর্গঠন ফিরিয়ে আনার রোডম্যাপ হিসেবে প্রচারিত হলেও, ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক সাইদ আরিকাতের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
পরিকল্পনার প্রকৃত উদ্দেশ্য
সাইদ আরিকাতের মতে, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য গাজার পুনর্গঠন নয়, বরং গাজাবাসীকে কোণঠাসা ও বাধ্য করা। মানবিক দায়বদ্ধতার ‘পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়াকে এখানে রাজনৈতিক নিপীড়নের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। প্রস্তাবের কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই এর আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়। গাজার বিধ্বস্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে জরুরি বৃহৎ পরিসরের পুনর্গঠন রাখা হয়েছে ১৫ নম্বর দফায়, অর্থাৎ একেবারে শেষ শর্তে। তাও শর্তসাপেক্ষে: কোনো এলাকা সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে আসার পরই সেখানে পুনর্গঠন শুরু হতে পারবে।
ফিলিস্তিনিরা তাদের ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল বা মৌলিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের অধিকার পাওয়ার আগে প্রথম ১৪টি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, পর্যায়ক্রমে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, গাজার নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন গভর্নিং বডি গঠন, যা ‘সংস্কারকৃত’ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) নিয়ন্ত্রণ নেওয়া পর্যন্ত বেসামরিক ও নিরাপত্তা বিষয় পরিচালনা করবে।
রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পুনর্গঠন
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, গাজার ধ্বংসকে তাৎক্ষণিক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে না দেখে, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে নতুন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুনর্গঠনকে এখানে যুদ্ধাস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। প্রস্তাবটি যুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো ফর্মুলাকেই নতুন করে সামনে এনেছে: কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বাইরে কোনো অস্ত্র বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলে পুনর্গঠন হবে না। এর মাধ্যমে গাজার ধ্বংসের দায় হামাসের ওপর চাপানো হলেও, ফিলিস্তিনি বাস্তবতার মূল প্রেক্ষাপট উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আড়াল করা হয়।
ফিলিস্তিনের সশস্ত্র প্রতিরোধ শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি; গাজার সামরিকায়নকে গত কয়েক দশকের অবরোধ, দখলদারিত্ব, ভূখণ্ড খণ্ডবিখণ্ডকরণ, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ ও রাজনৈতিক বিকল্প ধ্বংসের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল প্রতিরোধকেই মূল সমস্যা হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে, আর ইসরাইলি নিপীড়নের কারণগুলোকে অদৃশ্য করে দিচ্ছে।
কূটনীতির আলটিমেটাম
ম্লাদেনভের উদ্যোগের সতর্কবার্তায় এই বৈষম্য স্পষ্ট: তিনি বলেন, রূপরেখা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে গাজার বড় অংশে ইসরাইলের সাময়িক নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী হতে পারে। এটি সমঝোতার আহ্বান নয়, বরং রাজনৈতিক আলটিমেটাম—পরিকল্পনা মেনে নাও, নয়তো যুদ্ধের মাধ্যমে তৈরি ভূখণ্ডগত বাস্তবতা চিরস্থায়ী হবে। এই কূটনীতি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং একটি জাতিকে ক্লান্ত ও নিঃশেষ করার মাধ্যমে কাজ করে।
উদ্যোগের সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ: এটি ইসরাইলের নির্বাচন চক্রের দিকে ধাবিত হওয়ার সময় এসেছে, যখন অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতা প্রায় অসম্ভব। ইসরাইলি রাজনীতিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর নিরাপত্তা নীতি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর চরম আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতের সমাধান নয়, বরং কে বেশি সামরিক কঠোরতা দেখাতে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে। এই আবহে উদারতা প্রদর্শন নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হতে পারে।
মধ্যস্থতার সীমাবদ্ধতা
এই রাজনৈতিক বাস্তবতা ম্লাদেনভের মতো মধ্যস্থতাকারীদের কাজের পরিধি সংকুচিত করে দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে গাজাবিষয়ক কাঠামোর তদারকির জন্য নিযুক্ত করলেও, তার কার্যকারিতা ইসরাইলের বেঁধে দেওয়া সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গাজা প্রশাসনের জন্য গঠিত ফিলিস্তিনি কমিটির সদস্যরা মাসের পর মাস নিষ্ক্রিয়তা, যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা ও স্থবিরতার কারণে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই উদ্যোগ শুরু থেকেই কাঠামোগত বাস্তবতার দ্বারা শৃঙ্খলিত, যা কোনো দূতের পক্ষে অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
কমিটির পঙ্গুত্ব পুরো প্রক্রিয়ার আসল চরিত্র ফুটিয়ে তোলে: এটি আন্তর্জাতিক আইন বা নিরপেক্ষ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা স্বাধীন মধ্যস্থতা নয়, বরং ইসরাইলের ‘রেড লাইন’-এর মধ্যে পরিচালিত মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক প্রকল্প। ফলে, এই উদ্যোগ শান্তির মাধ্যম হওয়ার চেয়ে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনিদের বিভক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিপজ্জনক নজির
এটির বড় বিপদ সুদূরপ্রসারী: পুনর্গঠন যদি স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে। মানবিক পুনরুদ্ধার আর বেসামরিক নাগরিকদের অধিকার থাকবে না; মৌলিক প্রয়োজনগুলো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বণ্টিত শর্তসাপেক্ষ সুযোগ-সুবিধায় পরিণত হবে। এর ফলে বেসামরিক মানুষের কষ্টকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে। শাসক গোষ্ঠীগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য ফলাফল না আসা পর্যন্ত সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বাঁচতে বাধ্য করা যাবে। পুনর্গঠন তখন আর মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং রাজনৈতিক শৃঙ্খলা শেখানোর দমনমূলক ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ব্যবস্থাকে ‘বাস্তবসম্মত প্রগতি’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, ইতিহাস বলে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া অসম ব্যবস্থা কখনো স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। চরম ভারসাম্যহীনতার সুযোগে চাপিয়ে দেওয়া চুক্তি সাময়িকভাবে অসন্তোষ রাখলেও সংঘাতের মূল কারণ দূর করে না; বরং ক্ষোভকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং ভবিষ্যতের বড় বিস্ফোরণের পথ তৈরি করে।
গাজার পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র
গাজার ক্ষেত্রে এটি আরও সত্য: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংসের পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র দেখেছে, যার পর শুরু হয় আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পুনর্গঠন—যা মূল রাজনৈতিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত রেখে দেয়। অবকাঠামো নামমাত্র মেরামত করা হয়, মানবিক সহায়তা সাময়িকভাবে বাড়ে, কূটনৈতিক বিবৃতির বন্যা বয়ে যায়, এবং তারপর আবার ধ্বংসের চক্র শুরু হয়। বর্তমান উদ্যোগ সেই ব্যর্থ ধারার পুনরাবৃত্তি করার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মূল গলদ হলো এই ভুল ধারণা যে, দখলদারিত্ব, অবরোধ ও কাঠামোগত বৈষম্যের বাস্তবতা মোকাবিলা না করে শর্তসাপেক্ষ পুনর্গঠনের লোভ দেখিয়ে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
বঞ্চনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া স্থিতিশীলতা স্বভাবগতভাবেই ভঙ্গুর। যে জনগোষ্ঠীকে সার্বভৌমত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, তাদের প্রশাসনিক চাতুর্যের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বশ মানানো অসম্ভব। গাজার পুনর্গঠন প্রয়োজন, কিন্তু রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া জোড়াতালির পুনর্গঠন ভবিষ্যতের আরেকটি বড় পতনের অবকাঠামো তৈরি করার শামিল।
উপসংহার
আসল সমস্যা ম্লাদেনভের ১৫ দফা উদ্যোগের কারিগরি সফলতা বা ব্যর্থতা নয়; গভীর সমস্যা হলো এর পেছনের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা: এই বিশ্বাস যে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ও মানবিক পুনরুদ্ধার সব সময় শর্তসাপেক্ষ, বিলম্বিত ও বহিরাগতদের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশের অধীন। যত দিন আন্তর্জাতিক কূটনীতি এই বৈষম্যমূলক চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হবে, তত দিন গাজা এই অন্তহীন গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে থাকবে: পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হবে, বেছে বেছে কিছু বাস্তবায়ন করা হবে, এবং শেষ পর্যন্ত তা সংঘাত সমাধানের জন্য নয়, বরং সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ধামাচাপা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে।



