রাজশাহীতে হত্যা মামলার আসামির সংসদ সদস্যের সঙ্গে সেলফি, আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ
রাজশাহীতে একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি রাইসুল ইসলাম স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল হক (মিলন) এর সঙ্গে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী বিমানবন্দরে এই ঘটনা ঘটে, যা আইনের শাসন ও পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
হত্যা মামলার পটভূমি ও আসামির পরিচয়
রাইসুল ইসলাম রাজশাহীর মোহনপুর থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি। তিনি মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এবং বর্তমানে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৮ মার্চ মোহনপুরের সাঁকোয়া এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় মো. আলাউদ্দিন নামের এক জামায়াত কর্মী নিহত হন। ঈদের নামাজে ইমামতি নিয়ে বিতর্কের জেরে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। নিহত আলাউদ্দিন উপজেলা মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন।
এ ঘটনায় আলাউদ্দিনের ছেলে এমরান আলী বাদী হয়ে মোহনপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়, যেখানে প্রধান আসামি হিসেবে রাইসুল ইসলামের নাম রয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, আলাউদ্দিনের বুকের ওপর উঠে লাফালাফি করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর রাইসুল ইসলামের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হলেও এখনো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
বিমানবন্দরে সেলফি ও ইফতার মাহফিলে উপস্থিতি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে ঢাকা থেকে রাজশাহী ফেরেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শফিকুল হক (মিলন)। এই সময় বিমানবন্দরেই তাঁর সঙ্গে সেলফি তোলেন রাইসুল ইসলাম। ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে তিনি ক্যাপশনে লেখেন, ‘এয়ারপোর্টে ভাইকে রিসিভ করলাম। তারপর কেশরহাটে ইফতার মাহফিলে যোগদানের উদ্দেশে রওনা।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গাড়িবহরের সঙ্গে রাইসুল ইসলাম মোহনপুর থানার সামনে দিয়ে উপজেলার কেশরহাটে একটি ইফতার মাহফিলে অংশ নেন। কেশরহাট পৌর বিএনপি আয়োজিত এই ইফতার মাহফিলে হত্যা মামলাটির অন্য আসামিরাও উপস্থিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।
পুলিশের গ্রেপ্তার ব্যর্থতা ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপপরিদর্শক মোদাশ্বের হোসেন খান বলেন, আসামিদের জামিনের কোনো কাগজপত্র তিনি পাননি। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চললেও পলাতক থাকায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। বিমানবন্দর ও ইফতার মাহফিলে আসামিদের উপস্থিতি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, ‘এয়ারপোর্ট তো মোহনপুর থানার ভেতরে না। আর ইফতারে কেউ ছিল কি না, সেটা তাঁদের জানা নেই।’
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতারা হত্যা মামলার আসামিরা জামিন না নিয়েই সংসদ সদস্যের সঙ্গে থাকায় আশ্চর্য প্রকাশ করেছেন। কেশরহাট পৌর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টা আমরা জানলাম। এয়ারপোর্ট থেকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহনপুর থানার সামনে দিয়ে ইফতার মাহফিলে এলেন। আর পুলিশ নাকি তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা খুবই আশ্চর্য হলাম। আইনের শাসন কোথায়?’
আসামি ও সংসদ সদস্যের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে শুক্রবার রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে রাইসুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মামলায় এখনো জামিন হয়নি, তবে হাইকোর্ট থেকে জামিন হয়ে যাবে। জামিন না নিয়েই প্রকাশ্যে সংসদ সদস্যের সঙ্গে থাকা এবং ছবি পোস্ট করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং ফেসবুক থেকে ছবিগুলো সরিয়ে নেন।
হত্যা মামলার প্রধান আসামির সঙ্গে সেলফি প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য শফিকুল হক দাবি করেছেন, কে তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলেছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি। এই বক্তব্য ঘটনার গুরুত্ব ও জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ঘটনা রাজশাহীতে আইনের শাসন, পুলিশের কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।
