৭ মার্চের ভাষণের পর: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমান্তরাল প্রশাসন ও স্বাধীনতার প্রস্তুতিপর্ব
৭ মার্চের ভাষণ: সমান্তরাল প্রশাসন ও স্বাধীনতার প্রস্তুতি

৭ মার্চের ভাষণের পর: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমান্তরাল প্রশাসন ও স্বাধীনতার প্রস্তুতিপর্ব

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে চলে আসে। এই সপ্তাহটি ছিল মূলত একটি সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালনার বাস্তব অনুশীলন এবং আসন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিণতির জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রস্তুতিপর্ব।

ভাষণের প্রেরণা ও চার দফা দাবি

তৎকালীন রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বাঙালির স্বাধীনতা, মুক্তি ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের প্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখো মানুষের সামনে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৮ মার্চের পত্রিকাগুলোতে তার আগের দিনে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত চার দফা দাবি প্রধান শিরোনাম হিসেবে স্থান পেয়েছিল।

এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:

  • সামরিক শাসন প্রত্যাহার
  • সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া
  • গণহত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত
  • নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর

এই দাবিগুলোর ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তা কেবল রাজপথের সাধারণ বিক্ষোভ বা ধর্মঘট ছিল না। এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টির প্রয়াস। এই সময় থেকে সচিবালয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংকসহ সব প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নির্দেশনায় পরিচালিত হতে থাকে। জনগণকে সব ধরনের কর ও খাজনা প্রদান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সরাসরি আইনি ও নৈতিক অনাস্থার প্রকাশ।

সমান্তরাল প্রশাসন ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

তবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি সচল রাখতে ও পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচার রোধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থা পরিচালনার জন্য বিস্তারিত নির্দেশনামা জারি করেন। ব্যাংক ও বন্দরগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয় কেবল পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার জন্য। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এই সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) ও ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (ইপিসিএস) বাঙালি কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল নজিরবিহীন। রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় আমলারা প্রকাশ্যে সামরিক জান্তার আনুগত্য অস্বীকার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসহযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। “অসুস্থতার কারণ” দেখিয়ে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী নবনিযুক্ত গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান। হাইকোর্ট ভবন ও বিচারপতির বাসভবনসহ সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগের এই অবস্থান সামরিক সরকারের আইনি বৈধতাকে প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

রাজনৈতিক ঐক্য ও সামাজিক সমর্থন

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই সময়ে ব্যাপক ঐক্য পরিলক্ষিত হয়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ৯ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধুর চার দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। তিনি বলেন, ‘মুজিব রেসকোর্সে সংগ্রাম চালাইয়া যাওয়ার কথা বলিয়াছে। কেহ কেহ বলে যে মুজিব ইয়াহিয়ার সহিত আপোষ করিবে। আপোষের দিন চলিয়া গিয়াছে।’

১২ মার্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ অসহযোগ আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের নির্দেশ দেন। প্রথিতযশা শিল্পীরাও প্রতিবাদে অংশ নেন; শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব বর্জন করেন। সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক ও শ্রমিকেরা তাঁদের এক দিনের আয় শহীদদের সাহায্য তহবিলে দান করেন, যা আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।

আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও রাজনৈতিক জটিলতা

রাজনৈতিক এই অচলাবস্থার মধ্যেই সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছিল। পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খাদ্যবাহী জাহাজ জোরপূর্বক পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা পূর্ব পাকিস্তানে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক অবরোধের সামরিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত অবাঙালি এবং পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তা ও ধনী ব্যক্তিরা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) বিশেষ ফ্লাইটে করে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে শুরু করেন।

সম্ভাব্য ব্যাপক সংঘাতের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক মহলও এই সময়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। জাতিসংঘ তাদের বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিদেশি দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। একই সময়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ভারতের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের অগণতান্ত্রিক রূপকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

সপ্তাহের শেষভাগে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে। ১৩ মার্চ সামরিক জান্তা প্রতিরক্ষা খাতের বেতনভুক্ত বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়ে ১১৫ নম্বর সামরিক আদেশ জারি করে এবং অমান্যকারীদের সামরিক আদালতে বিচারের হুমকি দেয়। বঙ্গবন্ধু এই আদেশকে উসকানিমূলক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান যে কোনো প্রকার ভীতি প্রদর্শন করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা এয়ার মার্শাল আসগর খান ও ওয়ালী খান সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানালেও পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৪ মার্চ করাচিতে ‘দুই অংশে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর’ করার দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবি রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করে এবং প্রকারান্তরে সামরিক জান্তাকে শক্তি প্রয়োগের সুযোগ করে দেয়।

ইতিহাসের গতিপথ ও স্বাধীনতার অগ্রযাত্রা

পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ সালের ৮ থেকে ১৪ মার্চের ঘটনাবলি পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ অবসানের একটি পর্ব হিসেবে দেখা যায়। সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আমলা ও বিচার বিভাগের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান কার্যত একটি স্বশাসিত ভূখণ্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পূর্ব বাংলার মানুষ আর পরাধীন থাকবে না। তবে পর্দার আড়ালে যে ট্যাংকের গর্জন আর অস্ত্রের মহড়া চলছিল, তার জবাব দিতে যে কেবল বাঁশের লাঠি যথেষ্ট নয়; বরং একটি সশস্ত্র যুদ্ধ অনিবার্য, তা ইতিহাসের গতিপথেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।