ত্রয়োদশ সংসদে স্পিকার নির্বাচন: সাংবিধানিক জটিলতা ও সমাধানের পথ
ত্রয়োদশ সংসদে স্পিকার নির্বাচন: সংবিধান কী বলে?

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন: স্পিকার নির্বাচনে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আগামী ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন, যেখানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্ব নির্বাচন

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের পর বিএনপি সরকার গঠন করে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী–এনসিপি জোট সংসদীয় বৈঠকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছে।

স্পিকার নির্বাচনে সাংবিধানিক জটিলতা

সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, উদ্বোধনী অধিবেশনে সাধারণত পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে থাকায় তাদের কেউই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। ফলে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংবিধানের বিধান ও প্রক্রিয়া

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে: 'কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।'

সংবিধানে আরও বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলে, ডেপুটি স্পিকার, তার পদও শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।

সমাধানের সম্ভাব্য পথ

গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন। এরপর সংসদের মধ্যেই ভোট বা কণ্ঠভোটের মাধ্যমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। সাধারণত স্পিকার নির্বাচনের পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার পর সংসদের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়।

সংবিধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও পরবর্তী উত্তরাধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন। এই বিধান বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে এই সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেছেন।