পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এখন সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর থেকেই দলটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ছে, আর সাম্প্রতিক এক অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বুধবার টিএমসির ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহ করেন। তাদের নেতৃত্বে দুইবারের রাজ্যসভার সদস্য এবং উলুবেরিয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
দল ভাঙনের আশঙ্কা
এ ঘটনার পর দল ভাঙনের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এখনই পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে। দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।
বিজেপির জন্য সুবিধা নাকি ঝুঁকি?
বিজেপির একাংশ তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনকে স্বাগত জানালেও দলের ভেতরে ভিন্ন মতও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, টিএমসি ভেঙে পড়লে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে, যা বামফ্রন্ট বিশেষ করে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে বাম-কংগ্রেস জোট দখল করতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস মূলত পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক আঞ্চলিক শক্তি হওয়ায় বিজেপির জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সীমিত চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাম ও কংগ্রেস জাতীয় দল হওয়ায় তাদের সংগঠন ও প্রভাব বহু রাজ্যে বিস্তৃত। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা সিপিআই(এম)-এর সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও অনেক এলাকায় শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজেপির নীরব কৌশল
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসকে পুরোপুরি ভাঙতে আগ্রহী নয়। কারণ টিএমসি ভেঙে গেলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান বাম-কংগ্রেস জোট পূরণ করলে তা বিজেপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কিছু বিজেপি নেতা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, দলীয়ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী নেতাদের দলে নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দলের ভেতরে আশঙ্কা রয়েছে, অতিরিক্ত টিএমসি নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করলে বিজেপির সাংগঠনিক চরিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।
বামেদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত
দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় থাকার পরও বামফ্রন্ট আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিধানসভায় একটি আসনে জয় পেয়েছে সিপিআই(এম), ডোমকলে জয় পেয়েছে দলটি। এছাড়া দলীয় কার্যালয় সংস্কার, পুনরায় চালু করা এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠন সক্রিয় করার মতো কর্মকাণ্ডও দেখা যাচ্ছে। বাম সংগঠন সিআইটিইউ ও এবিটিএ-র মতো সহযোগী সংগঠনগুলোও আবার রাজপথে সক্রিয় হয়েছে। ফালতা পুনর্নির্বাচনে সিপিআই(এম)-এর দ্বিতীয় স্থান পাওয়া এবং ৪০ হাজারের বেশি ভোট পাওয়া তাদের পুনরুত্থানের আরেকটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাম পুনরুত্থানের সম্ভাবনা
একাংশ বিজেপি নেতার আশঙ্কা, ২০১৯ লোকসভা ও ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে যেভাবে বাম ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল, এবার পরিস্থিতি উল্টো হতে পারে; সেখানে বাম-কংগ্রেস জোট সেই ভোট আবার নিজেদের দিকে টেনে নিতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বামপন্থিদের পুনরুত্থান এখনও নিশ্চিত নয়। এর জন্য তাদের তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে হবে এবং বিজেপিকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তবে মাঠপর্যায়ে সংগঠন সক্রিয় করা, আন্দোলনে ফের সক্রিয় উপস্থিতি এবং কিছু নির্বাচনী সাফল্য বামদের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন শুধু একটি দলীয় বিষয় নয়, বরং তা রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণকেই নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



