নতুন মন্ত্রিসভার শপথ: সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
নতুন মন্ত্রিসভার শপথ: সুশাসন ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

নতুন মন্ত্রিসভার শপথ: সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা, ঢাকায় ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নতুন মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেছেন। এই অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা একটি উৎসবমুখর ও উদ্দীপনাপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন কমিশন একটি সুশৃঙ্খল ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো প্রেক্ষাপটে একটি অসাধারণ অর্জন।

নির্বাচন পরবর্তী বাস্তবতা: সুশাসনের লড়াই

নির্বাচন অনুষ্ঠান ছিল এই প্রক্রিয়ার সহজ অংশ, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা একটি রূপান্তরমূলক কাজ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা বিরোধী দলে বসছে। ক্ষমতাপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতা হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু সুশাসনের মূল লড়াইটি কেবল শুরু হয়েছে। দেশের ৪০ শতাংশ যোগ্য ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নেননি, যা নতুন সরকারের জন্য প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন

বাংলাদেশে নীতি বা কৌশলের অভাব নেই, সমস্যা হলো পুরোনো বাজে অভ্যাসের আধিক্য। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ এবং প্রভাবশালীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য আগের সরকার পরিবর্তনের পরও টিকে ছিল। এসব অভ্যাসের মূলোৎপাটন না হলে এবারও এগুলো বহাল থাকবে। সংবিধানে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও স্বাধীনতার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার: জনমুখী হতে হবে

নতুন প্রশাসন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কথা বলছে, যেমন ব্যাংক খাত স্থিতিশীল করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল প্রবৃদ্ধির হিসাব কষলে তা ক্ষমতাশালীদের পকেটই ভারী করবে। বাংলাদেশে বৈষম্য দূর না করেই অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার অতীত ইতিহাস রয়েছে, তাই এখন মূল প্রশ্ন হলো এই পুনরুদ্ধার জনমুখী হবে কিনা।

নারী ও যুবসমাজের অধিকার নিশ্চিতকরণ

শুরুটা করতে হবে নারীদের দিয়ে, যারা মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে মর্যাদা পান না। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় নারী ও কন্যারা নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা এবং বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। এ ধরনের সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। যুবসমাজের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

বাহ্যিক চাপ ও জলবায়ু সংকট

বাংলাদেশ এখন একটি জটিল ভূরাজনৈতিক বলয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাণিজ্য পথ, জ্বালানি সরবরাহ ও কূটনৈতিক পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন সরকারকে সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে শক্তিশালী প্রতিবেশী ও বিশ্বশক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু সংকট দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বিনিয়োগ, পরিকল্পনা ও সততা প্রয়োজন।

চর্চা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন

যেকোনো কৌশলের চেয়ে চর্চা বা সংস্কৃতি অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক রূপরেখা, জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা বা নারী নীতিসহ নানা কৌশল রয়েছে, কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের চর্চায়। দুর্নীতিকে মেনে নেওয়া, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে স্বাভাবিকীকরণ করা, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা মেনে নেওয়া এবং সমালোচকদের শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।

নতুন সরকারের পছন্দ ও নাগরিকদের ভূমিকা

নতুন সরকার এখন একটি কঠিন পছন্দের মুখোমুখি: অনুগতদের সুরক্ষিত বলয় থেকে শাসন করা নাকি নীতিগত উন্মুক্ততা থেকে দেশ পরিচালনা করা। টেকসই নেতৃত্বের জন্য ভিন্নমতের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন। তবে এই হিসাব-নিকাশ শুধু সরকারের একার নয়, নাগরিকদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তন চান কিনা। ব্যবসায়ী নেতারা, দলীয় সমর্থকেরা ও সমাজের অন্যান্য অংশের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের আয়োজন করতে সক্ষম। কিন্তু কেবল ব্যালট পেপার অন্যায়ের মূলোৎপাটন করতে পারে না, এটি কেবল একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। এখন আসল প্রশ্ন হলো, এই মুহূর্তটি কি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও জেন্ডার সমতাভিত্তিক ন্যায়নিষ্ঠ শাসনের দিকে একটি সত্যিকারের বাঁকবদল হবে? সবচেয়ে সহজ কাজটুকু শেষ হয়েছে, আসল হিসাব-নিকাশ শুরু এখন।