বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতা ও অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন
বিএনপির মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতা ও অভিজ্ঞতার অভাব

বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্যহীনতা ও অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। বিএনপির সংসদীয় দল সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করায় তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। তবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার।

আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বে মারাত্মক ঘাটতি

মন্ত্রিসভা গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫টি জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারীর মতো উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো ছাড়াও মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা অন্তর্ভুক্ত। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জে বিএনপি জয়ী হলেও সেখান থেকেও প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকে জামায়াত-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

দপ্তর বণ্টন ও অভিজ্ঞতার সংগতিহীনতা

দপ্তর বণ্টনেও অসমতা লক্ষ্য করা গেছে। তথ্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো ছোট মন্ত্রণালয়গুলোতে একজন পূর্ণমন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের থেকে মন্ত্রী নেওয়ার রীতি থাকলেও এবার সমতল থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করা হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করতে পারে।

মন্ত্রীদের মধ্যে অভিজ্ঞতার সংগতিহীনতাও চোখে পড়ছে। যাঁরা যে বিষয়ে অভিজ্ঞ, তাঁদের সেই মন্ত্রণালয় না দিয়ে অন্য দায়িত্ব দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। এহছানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকলেও, কৃষির সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ যুক্ত করা বা বাণিজ্যের সঙ্গে শিল্প ও বস্ত্র-পাট মেলানো যথার্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।

নারী ও সংখ্যালঘুদের স্বল্প অংশগ্রহণ

মন্ত্রিসভায় নারীর অংশীদারত্ব খুবই সীমিত। একজন পূর্ণমন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বিএনপির নারী নেতৃত্বের মধ্যে আরও যোগ্য নেত্রী থাকা সত্ত্বেও এই স্বল্প প্রতিনিধিত্ব নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি দলের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বও যথেষ্ট নয়।

মন্ত্রিসভার আকার ও গঠন প্রক্রিয়া

বিএনপি ভূমিধস বিজয়ের পর ছোট বা মাঝারি মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বললেও, বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। শপথ গ্রহণের রাতেই ১০ জন উপদেষ্টাকেও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ছায়া মন্ত্রিসভার অনুপস্থিতি এখানে লক্ষণীয়। বিএনপি দীর্ঘদিন সংসদের বাইরে থাকায় এই রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি।

খলিলুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও সমালোচনা চলছে। তিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, যাঁকে বিএনপির নেতারা একসময় কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর নিয়োগ বিএনপিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার মতো ব্যক্তির অভাব বা তাঁর প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে হতে পারে। সামনের দিনগুলোতে এই নিয়োগ নিয়ে সরকারকে বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিএনপির নতুন সরকার এলোমেলো ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে নমনীয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। নতুনত্ব আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মন্ত্রিসভায় তার ছাপ স্পষ্ট নয়। গতিশীল নেতৃত্ব ও জবাবদিহিমূলক সরকারই এখন জনগণের প্রত্যাশা।