প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে আইনের শাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার
গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার এবং দেশের সকল বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি সরকারের অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলো তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা তার সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
তিনি আরও যোগ করেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধ নীতি-নিয়মে পরিচালিত হবে। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বা জোর-জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।
রামাদান মাসে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ
পবিত্র রামাদান মাস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, রোজাদারগণ ইফতার, তারাবিহ ও সেহরির সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চান। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে তিনি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা সাধনকে প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদতের অংশ বলে তিনি মনে করেন।
বিএনপির সংসদীয় দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভার সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স-মুক্ত গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শের প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার সবক্ষেত্রে অনাচার ও অনিয়মের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়।
যানজট সমস্যা ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী বিভাগীয় শহরগুলোতে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যানজট সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই লক্ষ্যে সারা দেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথমেই রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, রেল যোগাযোগ সহজ, সুলভ ও নিরাপদ করা গেলে শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশের উন্নতি হবে।
দক্ষ জনশক্তি গঠন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন
প্রধানমন্ত্রী দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, তথ্য প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে কোনো না কোনো বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে।
তিনি দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী ও তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলেন, মেধা, জ্ঞান ও বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
সরকারের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর দেশে ফিরে তিনি দেশ ও জনগণের জন্য একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে তিনি তার পরিকল্পনার অনেক কিছুই জনগণের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সকল অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। তিনি ভবিষ্যতের দিনগুলোতে জনগণের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেষে বলেন, নবগঠিত সরকারের প্রতি সকল নাগরিকের অধিকার সমান। তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন যেন আল্লাহ সকলকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখেন এবং ইতিবাচক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের তৌফিক দেন।
