ড. ইউনূস ও সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকায় জাতীয় নির্বাচন সফল: নতুন সরকারের জন্য পরামর্শ
ড. ইউনূস ও সেনাবাহিনীর ভূমিকায় নির্বাচন সফল: নতুন সরকারের দায়িত্ব

ড. ইউনূস ও সেনাবাহিনীর ভূমিকায় সফল নির্বাচন: নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্মরণকালের মধ্যে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রশাসনের অনবদ্য ভূমিকা জাতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সমালোচকদের মুখে যেন ছাই পড়ে গেছে, কারণ ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নির্বাচনী ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা অর্জন করেছে। তাকে যদি রাষ্ট্রপতি বা অন্য কোনো উচ্চ পদে নিযুক্ত করা যেত, তবে প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো। তিনি শুধু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কাছেই নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি অলংকারস্বরূপ বিবেচিত হয়েছেন।

সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও বর্তমান ভূমিকা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০২৫ সালের জুলাই বিপ্লব এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাদের নিরপেক্ষতা জনগণের হৃদয় স্পর্শ করেছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামান নীরব থেকে সমালোচনা সহ্য করে জাতির লক্ষ্য অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা দেশবাসীকে ঋণী করে রেখেছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

নির্বাচনে একটি দল জান্নাতের সার্টিফিকেট দিয়ে ভোটারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেও, ভোটের মাঠে সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর প্রকাশ পেয়েছে। তবে ড. ইউনূস এ বিষয়ে নীরব থেকেছেন, যা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিরোধী দলের সমালোচনা সত্ত্বেও তাদের কাছে টেনে নিয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যা তার উদার মনোভাবের প্রতিফলন। টকশো ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

নতুন সরকারের জন্য জরুরি পদক্ষেপ

নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখা অপরিহার্য। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের উপর জোর দিতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে, তোষামোদকারীদের এড়িয়ে চলতে হবে এবং প্রতিটি কর্মসূচির পূর্বে গবেষণা করা আবশ্যক। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে, যা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন

শিক্ষা ক্ষেত্রে নামিদামি প্রতিষ্ঠানে বেতন কমানো এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দারিদ্র্য দূর করে স্বাবলম্বী করা নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তারদের পেশাদারি ও মানবিক হতে হবে, হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময়ের পর স্বল্প পারিশ্রমিকে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষদের উপকার করা যেতে পারে। ধর্মের অপব্যবহার রোধ করে সকল ধর্মের মানুষকে সমান সুযোগ দিতে হবে।

সাংবাদিকতা ও বিরোধী দলের ভূমিকা

হলুদ সাংবাদিকতা পরিহার করে বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সংবাদ পরিবেশন করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। সরকারের ভুল-ত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে সহায়তা করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে সরকারকে সহযোগিতা করা জরুরি। বিরোধী দলকে সংসদে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করতে হবে, রাজপথে আন্দোলন এড়ানো উচিত।

অতীতের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সতর্কতা

অতীতের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে, যেমন জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সময়ে জিয়া পরিবারের ক্ষতি হয়েছে। নতুন সরকারকে সাবধানতার সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করতে হবে এবং শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন পূরণে কাজ করতে হবে। তাদের মতো দেশসেবায় নিবেদিত হতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদের চেয়ে জনকল্যাণ প্রধান লক্ষ্য।

লেখক: মো. আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা।