বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এই শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
শপথ বর্জনের পেছনের কারণ
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। কিন্তু সংসদ নেতা ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি ডা. শফিকুর রহমান ও তার জোটের এমপিরা।
জাতীয় সংসদের উপনেতা মনোনীত হওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, 'সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বিএনপি নেয়নি বলেই প্রতিবাদ হিসেবে আমরা শপথ অনুষ্ঠানে যাইনি। এটি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ, একে পুরনো সংস্কৃতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলই হবো।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই ঘটনাকে বাংলাদেশের চিরাচরিত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরকে 'বর্জন' বা 'বয়কটের' রাজনীতির ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ বলছেন, এ ঘটনায় ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা স্বস্তিকর হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, 'সংসদে সরকার ও বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতিতে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়নি, বরং ওয়াক আউট, বর্জন আর সব ইস্যুতেই বিরোধিতা নিয়মিত বিষয় ছিল। এবারেও বিরোধী দল একই কাজ করলো। সবমিলিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা সুখকর হলো না।'
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলহীন সংসদ বানানোর অনেক উদাহরণ আছে, এমনকি 'গৃহপালিত বিরোধী' দলের তকমাও পেয়েছিল কোনো কোনো দল। ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদের পতন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আগ পর্যন্ত সংসদে 'বিরোধী দলের' ইতিহাসকে মোটামুটি 'গৃহপালিত বিরোধী দলের' ইতিহাস বলা যায়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর ওই সংসদে তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ৮৮ জন সদস্য থাকায় তখন বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা রাখার সংস্কৃতি তৈরির সুযোগ এসেছিল। কিন্তু তখন বিরোধী দলের নিয়মিত ওয়াক আউট, আর এক পর্যায়ে সংসদ বর্জনের কারণে সেই সংসদ আর শক্তিশালী বিরোধী দল পায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলছেন, 'বিরোধী দলের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথে না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। এটি এতো আত্মত্যাগের পর মেনে নেওয়া কঠিন। তবে আশা করি, সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পারিক দায়িত্বশীলতায় সংসদ কার্যকর হয়ে উঠবে।'
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদও বলছেন যে, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ সামনে আসবে এবং তখনই দেখার বিষয় হবে সেই সুযোগ তারা কতটা গ্রহণ করতে পারে।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য
মঙ্গলবার রাতেই এক বিবৃতিতে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, 'গণতন্ত্র কোনো একটি দিন বা একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে সেই যাত্রা অব্যাহত রাখব-ইনশাআল্লাহ।'
ডা. তাহের আরও যোগ করেন, 'জুলাই সনদ অনেকের আত্মত্যাগের মাধ্যমে এসেছে। আমরা সবাই তো একমত হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপি শুরুতেই সেটি থেকে সরে গেছে। সে কারণেই আমাদের প্রতিবাদ ছিল শপথে না যাওয়া।'
এই ঘটনা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হয়, তা এখনই দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
