সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিএনপির নতুন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিএনপির নতুন সরকারে

সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন

সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ মঙ্গলবার সকালে সংসদ ভবনে এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির নতুন সরকার গঠনের পর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

বিএনপির নতুন সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শপথ নেন। নতুন মন্ত্রিসভায় সালাহউদ্দিন আহমদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান, যা নির্বাচনী বিজয়ের পর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক পথচলা

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ (৬৩) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার–১ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। পরবর্তীতে তিনি সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশ না নিলেও, তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ কক্সবাজার–১ আসন থেকে সংসদে যান, যা পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে তুলে ধরে।

গুমের ঘটনা ও আইনি লড়াই

আওয়ামী লীগ শাসনামলে সালাহউদ্দিন আহমদ গুমের শিকার হন, যা একটি আলোচিত ঘটনা। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, এবং বিএনপি অভিযোগ করে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এই কাজ করেছে। দুই মাস পর ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে তাঁকে পাওয়া যায়, যেখানে পুলিশ দাবি করে যে তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করছিলেন।

ভারতে প্রবেশের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়, কিন্তু ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে তিনি খালাস পান। ভারত সরকারের আপিলের পর ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি আবারও খালাস পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন, এবং গত বছরের ৩ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ দাখিল করেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদের বিবরণ

সালাহউদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়ায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে প্রশাসন ক্যাডারে সরকারি চাকরি শুরু করে, ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ২০০১ সালে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে, তাঁর পেশা আইন পেশা ও ব্যবসা। আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে চাকরি, শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য:

  • অস্থাবর সম্পদ: ১০ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি
  • স্থাবর সম্পদ: ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি
  • নগদ অর্থ: ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা
  • ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা: ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা
  • বার্ষিক আয়: ৬ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি

হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে ৩৮টি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং বর্তমানে পাঁচটি মামলা সক্রিয় রয়েছে, যদিও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

জুলাই অভ্যুত্থানের পর সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফিরে বিএনপির হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংস্কারের আলাপে নেতৃত্ব দেন। এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, বিশেষত গুমের মতো ইস্যুগুলোর প্রেক্ষিতে। তাঁর এই নিয়োগ বিএনপির নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দলের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।