জামায়াত আমিরের তীব্র অভিযোগ: বিএনপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে অবজ্ঞা করেছে
জাতীয় সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলোচনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বিএনপির সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়াকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি উপেক্ষা ও অবজ্ঞা বলে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর পাশেই উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি এই ঘটনাকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আইনি সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
শপথ অনুষ্ঠানে সরকারি দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মঙ্গলবার বিকেলে সংসদ ভবনে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, সরকারি দল শপথ না নিয়ে তারা জুলাইকে উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করেছে। এতে জন–আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে তাদের অবস্থান বলে আমরা মনে করি। সংস্কারের বিপরীতে তাদের এই অবস্থান স্পষ্ট।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, সকালে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আজ ছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথের দিন। আমাদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল গতকাল গভীর রাতে, যা আমাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিদায়ক ছিল। তারপরও আমরা নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেশবাসীর প্রতি সম্মান রেখে শপথ নিতে এসেছি।’ তিনি অভিযোগ করেন যে, এবারই প্রথমবারের মতো সরকারি দল আলাদাভাবে আগে শপথ নিয়েছে, যা পূর্বের রীতির ব্যতিক্রম।
এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্য: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আইনি সংকট
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই ঘটনাকে গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকে সরকারি দল হিসেবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিল না, এটা গণভোটের যে গণরায় এসেছে “হ্যাঁ”–এর পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে, সেই রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে।’ নাহিদ ইসলাম জোর দিয়ে বলেন যে, এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নয়, বরং আইনি সংকট এবং জটিলতা তৈরি করেছে।
তিনি বিএনপির ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন না এবং বলেন, ‘গণভোট সংবিধানে ছিল না, তবে গণভোটের বৈধতা দিয়েছে জুলাই সনদ। সেটি সবাই মেনে নিয়ে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিয়েছে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যতের অবস্থান
শফিকুর রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা গণভোটের রায়কে সম্মান করেছি, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করেছি। যাঁরা আমাদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সম্মান করেছি এবং আমরা একমত হয়েছি যে এই শপথ নেওয়া আমাদের কর্তব্য।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিএনপি যদি জুলাইকে সম্মান করে এবং সংস্কারকে ধারণ করে, তবে তারা সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন।
জামায়াত আমির সরকারি প্লট ও ট্যাক্সবিহীন গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের এই সিদ্ধান্তে আমরা অবিচল এবং অটল। আমরা এই সুবিধা নেব না।’ তিনি আরও জানান যে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারের উদ্যোগে জামায়াতসহ ১১ দলের সমর্থন থাকবে, কিন্তু বিপরীত কিছু হলে তারা জনস্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
হামলা বন্ধের দাবি ও খলিলুর রহমান নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা
শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন যে, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোকে ভোট দেওয়ার কারণে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার ওপর ব্যাপক হামলা হচ্ছে। তিনি সরকারি দলকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখনই এসব হামলা বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারকে এ ব্যাপারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘এটা তো সরকারি দল তাদের চয়েজের মানুষ নিয়েছে। তবে আমরা এটাকে ফেয়ার মনে করি না। যাঁরা ইন্টারিম গভর্নমেন্টের পার্ট ছিলেন, তাঁরা আবার একটা রাজনৈতিক গভর্নমেন্টের অংশ হবেন—সেই জায়গায় প্রশ্ন উঠতেই পারে।’
এই আলোচনায় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
