তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের শপথ: দক্ষ মন্ত্রিসভা গঠনের চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের শপথ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার আজ মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ করেছে। এই বড় জয়ের পর তারেক রহমান প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্গঠনের যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা পুরোনো ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভোটে পরাজিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে তার দেখা করার ঘটনাটিও রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক চর্চার সূচনা করেছে।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের চ্যালেঞ্জ ও জন-আকাঙ্ক্ষা

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১২ ফেব্রুয়ারির পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে ব্যাপক জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেই পটভূমিতে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভার আকার এবং সদস্যদের তালিকা নিয়ে গত কয়েক দিনে নানা আলোচনা ও অনুমান চলছে। আমরা মনে করি, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মাপকাঠিই মন্ত্রিসভা গঠনের একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত। কারণ নতুন সরকার দেশকে কোন দিকে নিয়ে যেতে চায়, সেই সংকেতটি মন্ত্রিসভা দিয়েই নাগরিকরা প্রথমবারের মতো মূল্যায়ন করবে।

অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারের গুরুদায়িত্ব

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এমন এক সময়ে সরকার গঠন করছে, যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে; বিপরীতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি অত্যন্ত শ্লথ হয়ে পড়েছে। তারেক রহমান নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিএনপি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। ইশতেহারে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং’ কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

পুরোনো অভিজ্ঞতা ও মন্ত্রিসভা গঠনের সতর্কতা

বাংলাদেশের বিভাজিত সমাজকে ঐক্যের পথে নিয়ে যাওয়া, রাজনীতিকে রাজপথ থেকে সংসদে ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারসহ যেসব গুরুদায়িত্ব বিএনপি সরকারের ওপর এসে পড়েছে, তা বাস্তবায়িত হতে পারে কেবল একটি দক্ষ ও গতিশীল সরকারের নেতৃত্বেই। ফলে মন্ত্রী বাছাইয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত রাখতে হবে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক ছিল। অনেক মন্ত্রীর দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছিল, এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র, যোগাযোগ, নৌপরিবহন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বাণিজ্যসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপি এই পুরোনো তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো বিবেচনায় নেবে বলেই আমরা আশা করি।

সরকারের আকার ও জনপ্রশাসন সংস্কার

বিগত সরকারগুলোর আমলে সরকারের বিশাল আকার এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের নানা সুযোগ-সুবিধা সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে। এতে সরকারের পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়েছিল। এই বিষয়টি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা গড়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারে যে কমিশন করেছিল, তারা জনপ্রশাসন ও প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও কম ব্যয়বহুল করার উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা ৪৩-৫৫ থেকে কমিয়ে ২৫–৩০–এর মধ্যে আনার সুপারিশ দিয়েছিল। আমরা আশা করি, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপি এই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেবে।

স্থিতিশীলতা ও দক্ষ মন্ত্রিসভার গুরুত্ব

দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির জন্য একটি স্থিতিশীল সরকার পরিচালনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তারেক রহমান ঐক্য ও পুনর্গঠনের যে বার্তা এবং বিরোধী দলের প্রতি রাজনৈতিক যে সৌজন্যের চর্চা করেছেন, তা অত্যন্ত ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে দক্ষ, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গতিশীল মন্ত্রিসভা গঠন করা। এই মন্ত্রিসভাই নতুন সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার মূল নির্ধারক হিসেবে কাজ করবে।