নির্বাচন উত্তাপ শেষে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু, মন্ত্রিসভার শপথ আজ দক্ষিণ প্লাজায়
নির্বাচনের উত্তাপ শেষে আজ শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হচ্ছে নতুন সরকার, যা আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
শপথ অনুষ্ঠানের সময়সূচি ও আমন্ত্রিত অতিথি
সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন, আর বিকালে শপথ নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে নতুন সরকারের পাঁচ বছরের পথচলা। মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এক হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি অতিথিকে। আমন্ত্রিতদের তালিকায় রয়েছেন সার্কভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অনুষ্ঠানের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এস এম নাসির উদ্দিন জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের শপথ কক্ষে নবনির্বাচিতদের শপথ পাঠ করাবেন। বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন। সংসদ সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা সরকারি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নির্দেশ করে।
দক্ষিণ প্লাজায় ব্যতিক্রমী আয়োজন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। অতীতে বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠিত হলেও এবার তার ব্যতিক্রম হচ্ছে। ৫৫ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিকাল ৪টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্ত্রিসভার শপথ পাঠ করাবেন। প্রথা ভেঙে খোলা আকাশের নিচে এই আয়োজন প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের জানান, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথের বিষয়ে বিএনপি অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল। তিনি বলেন, জুলাই ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ও গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে এ স্থান বেছে নেওয়া হয়েছে। জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ ঘোষণার অনুষ্ঠানও এখানে হয়েছিল। প্রয়াত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন এই প্রাঙ্গণে হয়েছে, যা এই স্থানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে জোরালো করে।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও ভারতের প্রতিনিধিত্ব
তিনি জানান, সকাল ১০টায় সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। শপথের পর বিএনপি সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবে। বিকাল ৪টায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। আমন্ত্রণের বিষয়টি কেবিনেট ডিভিশন দেখছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্ক দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়নে ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।
জানা গেছে, ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন দেশটির লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এছাড়া ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন, যা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা
চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য যাত্রা শুরু করা নতুন সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অর্থনীতি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দিতে হবে প্রধান অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন সরকারের উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থবির অর্থনীতি সচল করা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ভারতসহ বহির্বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, মুখ থুবড়ে পড়া শ্রমবাজার পুনরুজ্জীবন, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক অস্থিরতা দূর করা এবং সর্বসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এছাড়া দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মভিত্তিক উগ্র মতাদর্শের উত্থানও নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। অন্তর্বর্তী সময়ের অস্থিরতা ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন যাত্রা শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। ড. মুহম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ১৮ মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোতেও অস্থিরতা দেখা দেয়। বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়। জনশক্তি রফতানিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতামত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দেশে কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদীর উত্থান ঘটেছে বলেও অনেকে মনে করেন। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় জনজীবনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। গত সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও ‘মব’ সংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনেও বিভাজন, পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে অস্থিরতা দেখা গেছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, “তৈরি পোশাক ও খনিজ খাত প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, এলএনজি আমদানি ও বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠু রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি জরুরি।”
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভুঁইয়া বলেন, “দক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই। প্রশাসনে দলবাজি হলে সরকার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। পক্ষপাতহীন প্রশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।” এই মতামতগুলো নতুন সরকারের সামনে থাকা জটিলতা ও অগ্রাধিকারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে।
