১১ দলীয় জোটের সমাবেশে মামুনুল হক: নির্বাচনে 'ইঞ্জিনিয়ারিং' ও 'নাটক' এর তীব্র অভিযোগ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের সমাবেশে তীব্র ভাষায় নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে 'সাজানো নাটক' ও 'সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং' বলে অভিযুক্ত করেছেন। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন এই জোটের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলের আগে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রতিবাদে সমাবেশ
সারাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের উদ্যোগে সোমবার বিকেলে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। পরে রাত পৌনে ১১টার দিকে জামায়াতের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মামুনুল হক তার বক্তব্যে বলেন, 'আমরা আশা করেছিলাম, বহু রক্ত-অশ্রু বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। মানুষ ব্যালটের অধিকার ফিরে পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষের ব্যালটের অধিকারের সঙ্গে নির্মম তামাশা করে একটি সাজানো ও পরিকল্পিত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে টার্গেট করা ব্যক্তিদের জাতীয় সংসদে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে এবং ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জনগণের অর্থে লালিত প্রশাসন ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রতি সতর্কবার্তা
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, 'আপনার পূর্ববর্তী সিইসির পরিণাম থেকে আপনি শিক্ষা গ্রহণ করুন। আমরা যে আপত্তি জানিয়েছি, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে জনগণের ব্যালটের অধিকার যদি ফিরিয়ে না দেন, বাংলার মানুষ তাদের অধিকার কেড়ে নেবে, ইনশাআল্লাহ।' তিনি জোটের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর চলমান পৈশাচিকতার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'আমাদের বোনদের ধর্ষণ করা হয়েছে, মা-বোনদের শ্লীলতাহানি ও শারীরিক লাঞ্ছনা দেওয়া হয়েছে। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।'
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'রক্ত দিয়ে যে জুলাই বিপ্লব হয়েছে, সেই বাংলাদেশে আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।' এছাড়া শহীদ ওসমান হাদী হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য রাখেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, 'আমরা জাতির সামনে ভোটচোরদের উন্মোচিত করতে পেরেছি। ওরা শুধু ভোট চুরি করেনি, বরং জনগণের ভোট ডাকাতি করেছে।' তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন পুরোনো সংস্কৃতির রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার বিরোধিতা করে বিএনপিকে নতুন বাংলাদেশে নতুন ব্যবস্থার রাজনীতি চর্চার আহ্বান জানান। খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল জলিল জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ইঞ্জিনিয়ারিং নির্বাচনের সমালোচনা করেন।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক উমর ফারুক অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখাকে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেন। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান গত কয়েকটি নির্বাচনকে 'সমঝোতার ভোট, একতরফা ভোট, রাতের ভোট, ডামি ভোট ও ম্যানেজ ভোট' বলে বর্ণনা করেন।
মামুনুল হক শেষে সবাইকে ঐক্য ও সংহতি মজবুত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'দেশের মানুষ ভাত ও ভোটের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলমান সংগ্রামকে মজবুত ও সংগত রাখতে হবে।' এই সমাবেশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান বিতর্ক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
