এনসিপি অবশেষে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করল
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অবশেষে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ছয়টায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনায় পৌঁছেছে এনসিপির প্রতিনিধিদল। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত ছিলেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা
জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে যমুনায় প্রবেশকারী এনসিপির প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন, যুগ্ম সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মূসা, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, মনিরা শারমিন ও জাবেদ রাসিন। তাদের উপস্থিতি এই প্রক্রিয়ায় দলের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটায়। এর আগে, এক বার্তায় জানানো হয়েছিল যে ছয় সদস্যের এই দল সন্ধ্যায় যমুনায় যাবে সনদে স্বাক্ষর করতে, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।
জুলাই সনদের পটভূমি
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ সাত মাস ধরে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়। সেদিন ২৪টি দল সনদে সই করে, পরে আরও একটি দল যোগ দেয়। তবে এনসিপি সেই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি এবং পরবর্তীতেও সই করেনি, যা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
এনসিপির পূর্ববর্তী অবস্থান ও দাবি
গত ১৬ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগের দিন এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর না করলে পরবর্তী সময়ে সই করার সুযোগ থাকবে। এসময় এনসিপি তিনটি দাবি জানিয়েছিল:
- জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগেই প্রকাশ করতে হবে এবং এই আদেশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে জারি করতে হবে।
- জনগণ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিলে নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) কার্যকারিতা থাকবে না।
- গণভোটের রায় অনুযায়ী আগামী নির্বাচিত সংসদ তাদের ওপর প্রদত্ত গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করবে এবং সংস্কার করা সংবিধানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।
এই দাবিগুলোর পরেও এনসিপি সনদে সই করেনি, যা তাদের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছিল।
গণভোট ও বাস্তবায়ন আদেশ
পরবর্তীতে গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই আদেশের অধীনেই জুলাই সনদের মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়লাভ করে, যা একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ নির্দেশ করে। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, যেখানে ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। এই ফলাফল সনদের প্রতি জনসমর্থনকে শক্তিশালী করেছে এবং এনসিপির স্বাক্ষরের পথ প্রশস্ত করেছে।
স্বাক্ষরের তাৎপর্য
এনসিপির স্বাক্ষর জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক ঐক্য ও সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়ায় নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক সংকেত দিচ্ছে।
