নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতে অপতথ্যের ছড়াছড়ি: ভুয়া ভিডিও ও দাবিতে উত্তেজনা
নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতে অপতথ্যের ছড়াছড়ি

নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতে অপতথ্যের ছড়াছড়ি: ভুয়া ভিডিও ও দাবিতে উত্তেজনা

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরদিন থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতের খবর প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোতে। তবে এবারের সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাগুলোতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য ও ভুয়া তথ্যের প্রবাহ। সংঘাতের সঠিক তথ্য জানানোর পাশাপাশি, ভুল দাবি ও মিথ্যা অভিযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে জড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।

ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের বিষয়ে তথ্য যাচাই করে এমন নয়টি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচনের পরের দুই দিনে অর্থাৎ গত ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি অন্তত তেরোটি ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনগুলোতে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাত বা বিক্ষোভের ভুয়া দাবিগুলো খণ্ডন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, একই ভুয়া তথ্য নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করলে সেটিকে একটি হিসেবেই গণনা করা হয়েছে।

জামায়াত সহিংসতার শিকার দাবিতে অপতথ্য

ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়েছিল, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ায় বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং এটি কুমিল্লার দেবীদ্বারের ঘটনা। তবে যাচাই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ভিডিওটি পুরোনো এবং নির্বাচনের এক মাস আগে থেকেই ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছিল। আবার অন্য একটি ভিডিও ছড়িয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে বলা হয়, নির্বাচনে জয়ের পর কুমিল্লায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা করেছেন অথবা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন বলে বাসাবাড়ি ভাঙচুর করা হচ্ছে। পরবর্তীতে এই দাবিগুলোও ভুল বলে প্রমাণিত হয়।

পুরোনো ভিডিওর অপব্যবহার

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল বের করে দিচ্ছে—এই দাবিতে সাত বছরের পুরোনো একটি ভিডিও ছড়াতে দেখা গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী হামলার প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল দাবিতে ভিন্ন ঘটনার একাধিক ভিডিওও এই সময়ে অনলাইনে ছড়িয়েছে, যা বাস্তবতার সাথে মেলে না।

বিএনপি ও জামায়াতকে লক্ষ্য করে অপতথ্য

ফেসবুকে নির্বাচন-পরবর্তী হামলার দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলা হয়, প্রতিপক্ষকে ভোট দেওয়ায় মানুষের ওপর হামলা চালাচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়া দলটি। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এটি আসলে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার দৃশ্য ছিল। আবার বিএনপির নেতা-কর্মীরা এনসিপি নেত্রীকে গণধর্ষণ করেছেন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেটিও সম্পূর্ণ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।

জামায়াতকে নিয়ে ভুয়া তথ্য

সংঘাত নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েও। সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর হারের পর হিন্দুদের ওপর ইসলামপন্থীরা হামলা করছে। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাইয়ে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় এক ব্যক্তিকে মারধরের দৃশ্য ছিল সেটি, যা সম্পূর্ণ আলাদা একটি ঘটনা।

এই অপতথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হামলার ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে জামায়াত হামলা করেছে বা সংঘাতে জড়িয়েছে বলেও মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। এই অপতথ্যগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, যা ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতায় অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।