চিকিৎসক থেকে সংসদ সদস্য: ঠাকুরগাঁও-২ আসনে ডা. সালামের সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড়
চিকিৎসক থেকে সংসদ সদস্য: ঠাকুরগাঁও-২ আসনের চ্যালেঞ্জ

চিকিৎসক থেকে জনপ্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

উত্তরের হিমেল হাওয়া আর তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিধন্য জনপদ ঠাকুরগাঁও-২ আসন। যেখানে মাটির নিচে শায়িত আছেন হেলে কিতু সিং কিংবা ভাষা সৈনিক দবিরুল ইসলামের মতো কিংবদন্তিরা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই জনপদটি কারাবন্দি সাবেক সাংসদ দবিরুল ইসলামের পরিবারের 'দুর্গ' হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদলে গেছে সেই চেনা সমীকরণ। দবিরুল-হীন ময়দানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত ইউরোলজিস্ট ও ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ডা. আব্দুস সালাম।

রুদ্ধশ্বাস নির্বাচনী লড়াই ও রাজনৈতিক বিভাজন

ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, এই আসনে লড়াই ছিল অত্যন্ত তীব্র ও সমানে-সমান। ধানের শীষ প্রতীকে ডা. সালাম পেয়েছেন এক লাখ একুশ হাজার সতেরো ভোট। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল হাকিম পিছিয়ে ছিলেন মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে। এই সংকীর্ণ ব্যবধান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ফারুক হোসেন সামাজিক মাধ্যমে আক্ষেপ করে লিখেছেন, এই আসনের প্রকৃত হকদার ছিলেন মাওলানা আব্দুল হাকিম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডা. সালামের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই জনমতের বিভাজন দূর করে সমগ্র এলাকার উন্নয়ন কাজকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া। একটি ঐক্যবদ্ধ জনপদ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সীমান্তবর্তী এলাকার জটিল সমস্যাবলি

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের ভৌগোলিক অবস্থানই এখানকার প্রধান সমস্যার উৎস। বালিয়াডাঙ্গী, রাণীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল এখন চোরাচালান ও মাদক পাচারের 'সুবিধাজনক করিডোর' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রত্নাই, মন্ডুমালা ও জগদল সীমান্ত দিয়ে শুধু মাদকই নয়, পর্যায়ক্রমে অবৈধ মারণাস্ত্রও বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করছে।

ফলে একদা শান্ত এই জনপদে ক্রমাগত বাড়ছে অস্থিরতা ও অপরাধের মাত্রা। জেলার পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণের কথা বললেও, বাস্তবে মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে উঠছে না।

স্বাস্থ্যসেবার নাজুক অবস্থা

বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক যেখানে সংসদ সদস্য, সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে ও অপর্যাপ্ত। হরিপুর কিংবা বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নত চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীদের ছুটতে হয় ঠাকুরগাঁও জেলা সদর হাসপাতাল বা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোকে তাদের শেষ সম্বল গরু-ছাগল বা এক চিলতে জমি বিক্রি করেই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হয়। সিপিবি নেতা অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন আহমেদের মতে, এ নিয়ে আন্দোলন অনেক হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নজর দেওয়া হয়নি। যদিও ডা. সালাম ইতিমধ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার পৈতৃক ভিটির নিকটস্থ হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করবেন। এলাকাবাসী এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

কৃষি খাতের সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্দশা

এই আসনের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড আজ মারাত্মক সংকটে নুইয়ে পড়েছে সার, বীজ ও সেচের অগ্নিমূল্যের কারণে। কাঁঠালডাঙ্গী এলাকার সবজি চাষি ফজলুর রহমানের ভাষায়, "আমরা সবজির ন্যায্য দাম পাই না, সমস্ত মুনাফা কুক্ষিগত করে নেয় ফড়িয়া ও দালাল শ্রেণি।"

এছাড়া রাণীশংকৈলের ধর্মগড় স্থলবন্দরটি দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকায় কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি চালাচালি হলেও গত কয়েক বছরে এই বন্দরটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় আলু ও ভুট্টা চাষিরা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।

সামাজিক ব্যাধি ও মানসিক সংকট

দারিদ্র্যের কষাঘাতের পাশাপাশি এই জনপদে থাবা বসিয়েছে নানা সামাজিক ব্যাধি। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথার কারণে নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। স্থানীয় প্রশাসনের অর্থসংকটের কারণে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে বাল্যবিবাহ বিরোধী বেশ কয়েকটি প্রকল্প।

বালিয়াডাঙ্গী থানার ওসি বুলবুল হোসেনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, হতাশা, দারিদ্র্য ও চড়া সুদের মহাজনী ঋণের জটিল জালে জড়িয়ে পড়েই অনেক মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এই সামাজিক সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

নতুন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব ও প্রত্যাশা

ডা. আব্দুস সালাম পেশায় একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি ভালো করেই জানেন কোন রোগের জন্য কী ধরনের চিকিৎসা বা পথ্য প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনের এই 'মাল্টি-অর্গান ফেলিওর' বা বহুমুখী সংকট সামলাতে তিনি কতটা সফল হবেন, তা এখন সময়ই বলবে।

আপাতত ঠাকুরগাঁও-২ আসনের মানুষ আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, নতুন এই সংসদ সদস্য তাদের সমস্যাগুলো জাতীয় সংসদে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করবেন এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার অবসান ঘটাবেন। উত্তরের এই সীমান্তবর্তী জনপদে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসবে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।