গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়: রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পথে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট জয়ী হয়েছে, যা 'না'-এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পেয়ে একটি স্পষ্ট জনসমর্থন প্রদর্শন করেছে। এই জয়ের ফলে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলে গেছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে।
ভোটের ফলাফল ও অংশগ্রহণ
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন, যেখানে 'না' ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন। এছাড়াও, বাতিল করা ব্যালট পেপারের সংখ্যা ছিল বিপুল—৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন।
গত বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল শুক্রবার বেলা তিনটায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০.২৬ শতাংশ। তবে রাতে নির্বাচন কমিশন গণভোটের সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করে, যাতে দেখা যায় ভোট পড়েছে ৬০.৮৪ শতাংশ এবং 'হ্যাঁ' ও 'না' এর ফলাফলে কিছু পরিবর্তন হয়েছে।
এলাকাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ
এলাকাভিত্তিক গণভোটের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা শহরে 'হ্যাঁ' ভোট বেশি পড়েছে এবং এখানে বাতিল হওয়া ব্যালটও কম। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-১০ আসনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি, যেখানে 'হ্যাঁ' পেয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৯ ভোট এবং 'না' পেয়েছে ৩৪ হাজার ৬৪১ ভোট। এই আসনে ব্যালট বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৬টি।
ঢাকার বাইরেও অনেক সংসদীয় আসনে গণভোটের ব্যালট পেপার বাতিল হয়েছে, যেমন কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ৩১ হাজারের বেশি ব্যালট পেপার বাতিল হয়েছে। তবে সেখানেও 'হ্যাঁ' জয়ী হয়েছে। মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু তিনটি আসনে (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান) 'না' ভোট জয়ী হয়েছে।
'হ্যাঁ' জয়ের প্রভাব ও সংস্কার প্রক্রিয়া
গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ার ফলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমবে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত, কিন্তু এই সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
এছাড়া, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে এবং আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে, যা কোনো একটি দলের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন করে তুলবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে।
সংস্কার প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন স্তর
২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। প্রথমে গঠন করা ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়, যা জুলাই জাতীয় সনদ হিসেবে পরিচিত।
৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত, এবং এগুলো নিয়েই গণভোট হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর রয়েছে: প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি; দ্বিতীয়ত, গণভোট; এবং তৃতীয়ত, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন।
গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় এখন তৃতীয় স্তর শুরু হবে, যেখানে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে।
সংস্কার প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত রয়েছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। এছাড়া, আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে সংবিধান সংশোধন করতে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
