খুলনায় নির্বাচনে তরুণ-মহিলা-সংখ্যালঘু ভোটারদের জোরালো উপস্থিতি
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে খুলনায় তরুণ, মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল। তবে কিছু গ্রামীণ ভোটার গণভোটের 'হ্যাঁ' ও 'না' ভোট দিতে বিভ্রান্তির মুখোমুখি হয়েছেন। জেলার ছয়টি আসনে মেট্রোপলিটন এলাকাসহ উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে দুই-তিনটি ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি।
ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশ
ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে শুরু করেন এবং দিনব্যাপী ভোটারের উপস্থিতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। বিএসএস প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা-২, খুলনা-৩ ও খুলনা-৫ আসনের বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এজেন্ট ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টরা মূলত অনুপস্থিত ছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতের এজেন্টরা দাবি করেছেন যে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া ভোটাররা ব্যালট প্রদানের পর উত্তেজনা প্রকাশ করেছেন।
প্রথমবারের ভোটারদের অনুভূতি
খুলনা-২ আসনের ভোটার ও খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার আরবি বিভাগের ছাত্র মামুন সকাল ৮টার দিকে খুলনা সরকারি সিটি কলেজে প্রথমবারের মতো ভোট দেন। তিনি বলেন, "আমি জীবনে প্রথমবার ভোট দিয়ে খুব খুশি।" খুলনা-৩ আসনের ভোটার ও খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী লাবনীও প্রথমবার ভোট দিয়ে ব্যাপক উৎসাহ প্রকাশ করেন। শহরের মিস্ত্রিপাড়ার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, আগের সরকারের সময় তিনি ভোট দিতে পারেননি। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, "খুব সুন্দর পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলছে। আশা করি, ভালো ফলাফল আসবে।"
মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ
খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) আসনের ঘোনার রামকৃষ্ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার ও গৃহিণী বিষখা দাস (৪০) বলেন, তিনি ভয়মুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। তিনি যোগ করেন, "শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে খুব ভালো লাগছে।" জনতা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার দীপঙ্কর মন্ডল উল্লেখ করেন, ভোটগ্রহণ উৎসবমুখর পরিবেশে এগিয়ে চলছে এবং মহিলা, পুরুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঘোনার রামকৃষ্ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার অপুর্ব কুমার দাস বলেন, ভোটারের উপস্থিতি ভালো ছিল এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তিনি যোগ করেন, "নতুন ভোটারসহ সব ভোটার উৎসবের মেজাজে ভোট দিয়েছেন।"
গ্রামীণ ভোটারদের গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি
তবে কিছু গ্রামীণ ভোটার গণভোটের ব্যালট নিয়ে বিভ্রান্তির সম্মুখীন হন। ডুমুরিয়া উপজেলার খারনিয়া ইউনিয়নের বামন্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার কাকলি রানি বলেন, "এত বছর আমরা এক কাগজে (ব্যালট) ভোট দিয়েছি। এবার তারা দুটি কাগজ দিয়েছে। নতুন গোলাপি কাগজটি পুরোপুরি বুঝে উঠার আগেই আমি চাপ দিয়েছি। আমার ভোট গণনা হয়েছে কি না, তা জানি না।" এই বিভ্রান্তি গ্রামীণ এলাকায় গণভোট প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ভুয়া ভোট এজেন্টদের শাস্তি
এদিকে, খুলনা-৬ আসনের কয়রা উপজেলার কয়েকটি কেন্দ্রে ভুয়া ভোট এজেন্ট সাজার অভিযোগে একটি মোবাইল কোর্ট ১১ ব্যক্তিকে প্রত্যেককে দুই বছর করে কঠোর শ্রমদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কয়রা থানার অফিসার-ইন-চার্জ মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, এজেন্ট হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিদের আটক করা হয়। প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন এবং তাদের ভুয়া এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করেন। এই ঘটনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগের ইঙ্গিত দেয়।
সামগ্রিকভাবে, খুলনায় নির্বাচনী দিনটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে কাটলেও গণভোট নিয়ে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি এবং ভুয়া এজেন্টদের শাস্তির মতো ঘটনা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জের দিকও নির্দেশ করে। তরুণ, মহিলা ও সংখ্যালঘু ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ততার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
