সংবিধান সংস্কার বিতর্ক: সংসদে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান
সংবিধান সংস্কার বিতর্ক: দুই পক্ষের অনড় অবস্থান

সংবিধান সংস্কার বিতর্ক: সংসদে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর শপথ অনুষ্ঠানে এক ব্যতিক্রম ঘটনার সাক্ষী হয়েছে দেশবাসী। ১৭ ফেব্রুয়ারি পরপর দুটি শপথ নেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয়ী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন এমপিরা; একটিতে সংসদ সদস্য ও অন্যটি ছিল ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’র সদস্য হিসেবে। তবে বিপত্তি ঘটে সরকার গড়তে যাওয়া বিএনপির সদস্যরা শপথ নিতে এলে। সেদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ অনুষ্ঠানের ডায়াসে গিয়ে সাফ জানিয়ে দেন, দ্বিতীয় শপথপত্রটি সংবিধানের আলোকে নয়, সে কারণে তারা সেই শপথ নেবেন না।

এরপর সংসদের প্রথম অধিবেশনেও দুই শিবিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি-তর্কও হয়েছে। কিন্তু নিজেদের দাবির পক্ষে নিজেদের অবস্থান থেকে সরেননি কেউই। সবশেষ গত ২৯ এপ্রিল সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, তারা সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। তাই এ নিয়ে ১৭ সদস্যের ‘সংশোধন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এতে সরকারি দলের ১২ ও বিরোধী দল থেকে পাঁচ জন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তাই প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’

এরই মধ্যে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তারা এ নিয়ে সরকারকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে চান না। দুইপক্ষের এমন অনড় অবস্থান নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আসলে গণভোটের রায় শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে কী? এই সমস্যার সমাধান কোন পথে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জানতে চাইলে সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একদল বাঁশের মই দিয়ে ওপরে উঠতে চায়, আরেক দল চায় সরাসরি বাঁশ দিয়ে উঠতে। তাহলে কোনটা সঠিক হবে? তার মতে এ বিষয়ে সমাধানের পথ বলা কঠিন। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি সংবিধানেই সুন্দর সুন্দর কথা লেখা আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন অনেক সময় নাও হতে পারে।’ তাই সংবিধান সংশোধন না সংস্কার এ বিতর্ক নিয়ে কিছু বলতে চান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যা আছে সংস্কার আদেশে

জুলাই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। শেখ হাসিনার আমলে হওয়া সংবিধানের বিতর্কিত সংশোধনীগুলো (যেমন ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল) পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) তাদের মিত্ররা।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সই করা হয়। এই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হয়েছিল বিএনপি। আর কয়েকটি প্রস্তাবে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েই শেষ পর্যন্ত অন্য দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যে যায় দলটি।

সনদটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর জারি হয় ‘গণভোট অধ্যাদেশ’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

জুলাই সনদে বলা হয়, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির এই পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। যার শেষ সময়সীমা ছিল গত ১৫ মার্চ। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা।

সংস্কার-সংশোধন, দুই পক্ষের অবস্থান

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সময় শেষ হয় ১৫ মার্চ। এ নিয়ে গত ৩১ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতার আনা একটি মুলতবি প্রস্তাবে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। সেদিনও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেদিন এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান সংস্কারের আলোচনাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য কমিটি করা যেতে পারে।

তবে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা সংবিধান সংস্কার চায়।

জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় বিএনপির ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কারের জন্য এই সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা।

কী প্রস্তাব দিয়েছিলেন আইনমন্ত্রী

সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠনে বিরোধী দলের অনড় অবস্থানের মধ্যেই নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি জানান, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। এ ১৭ সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে থাকবেন ৫ জন। আমাদের ১২ জনের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। শতাংশ হিসাবে করতে গেলে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ আসে। সেখানে তারা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচ জনের নাম চেয়েছেন। তিনি বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন এবং জুলাই সনদ সামনে রেখে তারা এগিয়ে যেতে চান।

দুপক্ষই অনড়

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে সংসদ থেকে রাজপথে গড়িয়েছে বিরোধীদলের আন্দোলন। অপরদিকে সরকারি দল বিএনপি বিদ্যমান সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। এই ইস্যুতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট।

সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জোট নেতারা দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। আগামী ১৬ মে রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশ থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ধারাবাহিকভাবে অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথাও জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে। সরকারের দেওয়া সংশোধন কমিটির পক্ষে আমরা নেই। আর যে পাঁচ জনের তালিকা চাওয়া হয়েছে, আমরা তা দেবো কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।’

অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জুলাই সনদের প্রতিটি পর্ব অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবেন। তারপরও বিরোধী দল অহেতুক ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। তবে আমরা সংবিধানের বাইরে কোনও দাবির পক্ষে নই।’