১৬৮ সাংবাদিকের প্রেস কার্ড বাতিল: পুনর্বিবেচনায় অগ্রগতি নেই, হতাশা
১৬৮ সাংবাদিকের প্রেস কার্ড বাতিল: পুনর্বিবেচনায় অগ্রগতি নেই

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন অভিযোগে ১৬৮ সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন (প্রেস) কার্ড বাতিল করে। পরে সমালোচনার মুখে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে প্রতিবাদ

আজ রবিবার (৩ মে) ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বানের দিন। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য তথ্যের খোঁজে সাংবাদিকরা বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে, বিশেষ করে সচিবালয়ে অবাধ যাতায়াতের জন্য দেওয়া অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেওয়া হয়। সেই কার্ড নবায়ন কার্যক্রম স্থবির রেখে সেই স্বাধীনতা সরকার কতটা নিশ্চিত করছে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রেস সচিবের স্বীকারোক্তি

অন্তর্বর্তী সরকারের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তৎকালীন বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছিলেন, সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আপিলের সুযোগ ও অগ্রগতির অভাব

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাতিল হওয়া অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নবায়নের বিষয়ে আপিলের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাদের কার্ড বাতিল হয়েছে তারা আপিল কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবেন। আপিল কমিটি আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে পুনর্বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, এখন পর্যন্ত কতজন সাংবাদিক আবেদন করেছেন এবং কতজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কার্ড বাতিলের প্রক্রিয়া ও অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’, ‘পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতা’ এবং ‘পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে তিন দফায় সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা সরকারি অনুষ্ঠান, সচিবালয় ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কভারের অনুমতি হারান। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ২০ জন, ৩ নভেম্বর ৩০ জন এবং ৭ নভেম্বর ১১৮ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করে পৃথক তিনটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। সবগুলো আদেশেই উল্লেখ করা হয়, ‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন নীতিমালা ২০২২’-এর আলোকে এসব কার্ড বাতিল করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া

কার্ড বাতিলের পর অনেক সাংবাদিক নতুন করে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নবায়নের আবেদন করলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাদের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ভর ছিল এবং ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যাচাইয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছিল না। অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রমাণ প্রকাশ না করেই তালিকা করা হয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।

কার্ড বাতিল হয়েছে, এমন একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা হয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের। তারা নাম প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্ড নবায়ন বা পুনর্বহালের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা উচিত। তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা গেলে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায়, এ ইস্যু দীর্ঘমেয়াদে সাংবাদিকতা পেশায় বিভাজন ও আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

সরকারের বক্তব্য

সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড দেওয়া ও বাতিলের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে এবং আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যোগ্যতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্বেগ

দীর্ঘদিনেও বাতিল হওয়া অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবিলম্বে সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাতিল কার্ড নবায়ন ও পুনর্বহাল করতে হবে, যাতে সাংবাদিকদের অবাধ যাতায়াত ও মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত হয়।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।

মানবাধিকার কর্মীর মতামত

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদের ঘনিষ্ঠদের একচেটিয়াভাবে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নীতিমালা থাকলেও অনেক সময় তা অনুসরণ করা হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৬৮ জন সাংবাদিকের কার্ড বাতিলের পর বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে নিষ্পত্তি করা উচিত ছিল। অন্যথায় প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কার্ড বাতিল ও দেওয়া একটি বৈষম্যমূলক চর্চায় পরিণত হতে পারে।’

তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য

বাতিল হওয়া অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বিষয়ে নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আছে কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত প্রধান তথ্য অফিসার (প্রেস ও মনিটরিং) ইয়াকুব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর আপিল কমিটি যাচাই-বাছাই করে বিষয়গুলো বিবেচনা করছে।’