জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, এ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাঁদের ধারণাগত ভিন্নতা রয়েছে। তাঁরা প্রস্তাবটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
আইনমন্ত্রীর প্রস্তাব
বুধবার মধ্যাহ্নবিরতির পর সংসদের বৈঠকে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির জন্য ১২ জনের নামের তালিকা তাঁরা ঠিক করেছেন। এই তালিকায় বিএনপি, গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য আছেন সাতজন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, শতাংশ হিসাবে করলে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ আসে। তাই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম চাওয়া হচ্ছে। বিরোধী দল পাঁচজনের নাম দিলে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) কমিটি–সম্পর্কিত প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন এবং জুলাই সনদ সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যাবে।
ডেপুটি স্পিকারের আহ্বান
আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিরোধীদলীয় নেতাকে উদ্দেশ করে বলেন, বিএনপি থেকে সাতজন এবং অন্যান্য সংগঠন থেকে পাঁচজন নিয়ে এই ১২ জনের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিরোধী জোট থেকে পাঁচজনের তালিকা চাওয়া হচ্ছে। এই ১৭ জনকে নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করেন পাঁচজনের তালিকা দিতে যাতে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে।
বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থান
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে চিফ হুইপ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনার বিষয় আছে। কারণ, ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। আমরা আলোচনা করে জানাব। আজকেই সিদ্ধান্ত হবে না। আমরা রিফর্ম (সংস্কার) চেয়েছি, কিন্তু এখানে হচ্ছে সংশোধন। এই জায়গায় আগেও মতপার্থক্য ছিল, এখনো রয়েছে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, প্রস্তাব তাঁরা দিয়েছেন, আমরা তা শুনলাম। কিন্তু পরে জানাব। এখনই কিছু বলছি না।
আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর আইনমন্ত্রী তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এতে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা অপেক্ষা করব। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনে এগিয়ে যাব। যদি অপেক্ষা করতে হয়, পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্তও অপেক্ষা করতে অসুবিধা হবে না।
প্রসঙ্গ ও পটভূমি
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান–সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমত অনুসারে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তাঁরা সংবিধান সংস্কার চান।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোয় বিএনপির ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংস্কারের জন্য এই সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে গত ৩১ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতার আনা একটি মুলতবি প্রস্তাবে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। সেদিনও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেদিন এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধান সংস্কারের আলোচনাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য কমিটি করা যেতে পারে।



