দীর্ঘ অস্থিরতার পর বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এই সরকার নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে দুই মাস পার করে এগিয়ে চলেছে। এখন কোন বিষয়গুলো তাদের প্রধান বিবেচনায় নিতে হবে, তা নির্ধারণের সময় এসেছে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ
আমার বিবেচনায়, প্রথমেই অর্থনীতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারলে মানুষ নির্ভয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। বিশেষ করে স্বল্প পুঁজির বিনিয়োগকারীরা তখন অর্থনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। বর্তমানে ভয়ের কারণে তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। একইসঙ্গে বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীরাও সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্থিতিশীল বাজারে আসতে চায়। স্থিতিশীলতা না থাকলে তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হলে আগে দেশি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি কর আদায় বাড়ানোর ক্ষেত্রে মানুষের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বরং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব। যত বেশি মানুষকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যাবে, ততই বিনিয়োগ ও কর আদায় বাড়বে।
শেয়ার বাজার ও মূলধন প্রবাহ
এরপর শেয়ার বাজারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শেয়ার বাজারে আস্থার ঘাটতি রয়েছে, ফলে অর্থনৈতিক বাজারে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। আস্থাহীনতার কারণে অল্টারনেট সোর্স অব ক্যাপিটাল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। পার্টনারশিপভিত্তিক ব্যবসার বিকাশও থমকে আছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির গতি অনেকটাই স্থবির। এই অবস্থায় যদি অর্থনীতির বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং ব্যাংকের বাইরে থেকেও মূলধনের প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথ খুলতে পারে। সরকারের জন্য এটি এখনই একটি দ্রুত ও জরুরি করণীয় বিষয়।
মৌলিক অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
আমার মনে হয়, অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের অবস্থান প্রশংসনীয়। তবে একইসঙ্গে মৌলিক অধিকার—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে দিকেও সমান মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলো ধারাবাহিকভাবে সচল রাখতে হবে।
মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দলীয়করণের বাইরে গিয়ে মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। কারণ মেধাবীরা তাদের মেধার জায়গা থেকেই কাজ করে। ক্লাসে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীকে আলাদা করে বলা লাগে না কীভাবে ভালো করতে হবে। তারা নিজের কাজের দিক ও দায়িত্ব নিজেরাই বুঝে নেয়।
সমস্যা হলো, আমাদের প্রচলিত আমলাতন্ত্র অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে সেখানে নতুন বা র্যাডিক্যাল পরিবর্তন আনা কঠিন হয়। তাই পরিবর্তনের জন্য মেধাভিত্তিক সমাজ ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়া বিকল্প নেই। মেধাকে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।
মেধা মূলত তার নিজস্ব মানদণ্ডেই কাজ করে। একজন ভালো ছাত্র, একজন দক্ষ শিল্পী বা গবেষক—তারা ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা থেকেই এগিয়ে যায়। তাদের সবসময় আলাদা করে তদারকি করতে হয় না। তারা নিজেরাই জানে কোথায় কীভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারা দলের জন্য নয়, দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়েই এগোয়।
যদি সব ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আবার পুরোনো ও অকার্যকর সিস্টেমেই ফিরে যাবো। সেই সিস্টেম ইতোমধ্যে ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে। তাই সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংবাদপত্রে যদি দক্ষ মানুষ নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে বানান বা সম্পাদনার জন্য আলাদা নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। একজন দক্ষকর্মী নিজেই কাজটি ঠিকভাবে করে। একইভাবে ভালো কারখানা শ্রমিক নিয়োগ পেলে তাকে বারবার নির্দেশ দিতে হয় না—সে নিজের কাজ নিজেই জানে।
তাই দল নয়, মেধাকে জায়গা দিতে হবে। তবে রাজনৈতিক দল থাকবে, কারণ তারা ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধাবীদের যথাযথ জায়গা দিতে হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
শুরুতে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে নতুন মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার সংঘাত দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব। আস্থা রাখতে পারলে সেখান থেকেই যুগান্তকারী ফল আসতে পারে।
আমাদের এখন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর পঞ্চম শিল্প বিপ্লব আসছে। বিশ্ব ধীরে ধীরে আরও সংযুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে। শ্রম রফতানি-নির্ভর অর্থনীতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে ‘মেধা’কে একটি সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। অর্থাৎ মেধা বিক্রি বা কাজে লাগানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
একইসঙ্গে আমাদের “দোসর খোঁজার সংস্কৃতি” থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাস্তবতা হলো, বড় প্রকল্প মানেই বড় মেধা, আর বড় মেধা মানেই বড় সিদ্ধান্ত ও বড় বিনিয়োগ। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দক্ষতাই মূল বিষয় হওয়া উচিত।
মেধাবীরা অনেক সময় বড় প্রকল্প বা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন—এটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ে আটকে রাখা বা সন্দেহের চোখে দেখা হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মেধাকে দলমতের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। যেমন– কয়লা বা তেল কোথা থেকে এসেছে সেটা নয়, বরং সেটা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ; মেধাও তেমনই একটি সম্পদ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাকে “ফুয়েল” হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ইঞ্জিনের দিক সরকার ঠিক করবে, কিন্তু ইঞ্জিন চালানোর শক্তি আসবে মেধা থেকে। সেখানে দলীয় পরিচয় দিয়ে বিভাজন তৈরি করলে রাষ্ট্রের ক্ষতিই হয়।
মনে রাখতে হবে, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতে শাস্তি বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকেই। তাই মেধাকে সুযোগ দেওয়া মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ হারানো নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর করা।
আজকের বিশ্বে যারা সফল হয়েছে, তারা মেধাকে দল, জাতি বা পরিচয়ের বাইরে রেখে ব্যবহার করেছে। গাছ কার জমিতে আছে তা নয়, গাছ ফল দিচ্ছে কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের শ্রমবাজারও পরিবর্তিত হচ্ছে। কায়িক শ্রম ধীরে ধীরে যন্ত্র ও প্রযুক্তির হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতি দিয়ে আর দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
এই বাস্তবতায় মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব



