পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে হারের পর তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভোটে কারচুপির বিরুদ্ধে এটি তার প্রতিবাদ। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে হোক, কিন্তু তা যেন লিপিবদ্ধ থাকে। মমতার এই অবস্থানকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর পদত্যাগ না করার সঙ্গে তুলনা করে একটি কলাম লিখেছেন ইন্ডিয়া টুডের রম্যলেখক ও কলামিস্ট কমলেশ সিং। তিনি কলামটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘মমতা ডোনাল্ড ব্যানার্জি’।
মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার ক্ষমতা অসীম
কমলেশ সিং লিখেছেন, মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার ক্ষমতা অসীম। ২০২০ সালের নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা আবিষ্কার করেছিলেন, ২০২৬-এর মে মাসে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন তারই পুনরাবৃত্তি করলেন। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ব্যবধান থাকলেও দুই নেতার আচরণের ব্যাকরণ হুবহু এক।
২০২০ সালের ৩ নভেম্বর ভোটের ফলাফল যখন ট্রাম্পের বিপক্ষে যাচ্ছিলো, তখন পাটিগণিতের অমোঘ সত্য মেনে নেওয়ার বদলে তিনি রাত ২টায় নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরবর্তী ৬৩ দিন তিনি এক বিশাল ‘ষড়যন্ত্রের জাল’ বুনলেন, যেখানে নিজেকে বঞ্চিত সম্রাট এবং কোটি কোটি ভোটারকে প্রতারক হিসেবে তুলে ধরেন। আদালতে একের পর এক মামলা হারলেও তিনি জনসভা চালিয়ে গেছেন, এমনকি জর্জিয়ার নির্বাচনি কর্মকর্তাকে ফোন করে সুনির্দিষ্টভাবে ১১ হাজার ৭৮০টি ভোট ‘খুঁজে বের করার’ অনুরোধও করেছিলেন।
এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলা। ট্রাম্পের ‘নরকের মতো লড়াই’ করার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সমর্থকরা মার্কিন গণতন্ত্রের প্রতীক সেই ভবনে তাণ্ডব চালায়। যে ভবন ১৮১৪ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল, তা নিজ দেশের নাগরিকদের হাতেই ক্ষতবিক্ষত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের দৃশ্যপট ও অদ্ভুত সাদৃশ্য
ইতিহাস যে কত নাটকীয় হতে পারে, তার প্রমাণ মিললো ২০২৬ সালের ৪ মে পশ্চিমবঙ্গে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জিতে প্রথমবার ক্ষমতায় এলো বিজেপি। ২০১১ সাল থেকে দাপট দেখানো তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত ধুলোয় মিশে গেলো। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আসনেই হেরে গেলেন। কিন্তু ট্রাম্পের মতোই তিনি পরাজয় মেনে নিতে নারাজ। তার দাবি, নির্বাচন ‘চুরি’ করা হয়েছে।
মমতা অভিযোগ করেছেন, ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ১০০টিরও বেশি আসন ‘জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া’ হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নজিরবিহীন। সাধারণত কমিশনের বিরুদ্ধে ঢিলেমি বা বিশেষ দলের প্রতি অনুকূল সময়সূচি নির্ধারণের অভিযোগ উঠলেও, ১০০টি আসনে কারচুপি করার মতো প্যারা-মিলিটারি অপারেশন চালানোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিস্ময়কর।
নেতৃত্বের ধরন ও রাজপথের আদালত
ট্রাম্প ও মমতা উভয়েই নিজেদের ‘জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর’ এবং ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা যখন জনগণের রায়ে প্রত্যাখ্যাত হন, তখন সিদ্ধান্ত নেন যে জনগণ নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত অথবা বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্প বুলেটপ্রুফ ঢালের আড়াল থেকে বলেছিলেন ‘কখনও পরাজয় স্বীকার করব না’। আর মমতা সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করলেন ‘আমি হারিনি, পদত্যাগ করব না’। দুটির কার্যকারিতা একই।
মমতার এই বক্তব্য তার কর্মীদের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ হিসেবে গেছে, ‘রাজপথই হলো আসল আদালত’। ফলাফল যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গে ভোট-পরবর্তী সহিংসতা শুরু হয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন জেলায় খুন, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর আসছে। মধ্যমগ্রামে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ক্যাপিটল হিলের হামলার সঙ্গে এর মাত্রাগত পার্থক্য থাকলেও যুক্তিটা একই।
গণতন্ত্র ও পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি
গণতন্ত্র একটি দাবিদাওয়া সম্পন্ন ব্যবস্থা, যা অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে একটি কঠিন জিনিস চায়, তা হলো পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এটি বোঝেন ও মেনে নেন। কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন তাদের হার মানেই প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ।
ওয়াশিংটনে ২০২১ সালে গণতন্ত্রকে দরজার সামনে আক্রমণ করা হয়েছিল, আর ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গে সেই আক্রমণের লক্ষ্য হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপসংহার। রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ছিল অবাধ ভোট নিশ্চিত করতে, কিন্তু ভোট-পরবর্তী রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সম্ভবত কেউই প্রস্তুত ছিল না।
ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলেছিলেন। তবে মমতা এখনও অনড়। তিনি এখন তার ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সঙ্গীদের কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছেন, যারা নিজেরাও শোচনীয়ভাবে হেরেছেন এবং একে অপরের সাহচর্য খুঁজছেন। পৃথিবী হয়তো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মুখোমুখি।



